• ছন্নছাড়া ফুটবল, বিশ্রি রক্ষণ, ফ্রান্সকে ২-০ উড়িয়ে ১৬ বছর পর ফাইনালে স্পেন
    এই সময় | ১৪ জুলাই ২০২৬
  • স্পেনের পাসিংয়ের জালে আটকে গেল ফ্রান্স। এমবাপেদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট কেটে নিল লা রোহা। ডালাসের সেমিফাইনালে শুধু জেতেইনি স্পেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রেখেছিল তারা। ফরাসিদের তারকাখচিত দলকে কার্যত নিষ্প্রভ করে দিয়ে ২-০ গোলের দাপুটে জয় তুলে নেয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের (Luis de la Fuente) দল।

    কাগজে-কলমে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ছিল তারকায় ভরা। কিলিয়ান এমবাপে, ওউসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা কিংবা দেজিরে দুয়ে — কেউই স্পেনের রক্ষণ ভেদ করার পথ খুঁজে পাননি। ম্যাচ জুড়ে ফরাসি তারকাদের যেন আটকে রেখেছিল স্পেনের লাল-নীল দেওয়াল।

    অন্যদিকে বলের দখল, পাসিং আর ছন্দের উপর পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের। মাঝমাঠে একের পর এক পাসে ফ্রান্সকে দৌড় করিয়েছে তারা, আর সুযোগ পেলেই আক্রমণে শানিয়েছে ধার। ম্যাচের অনেকটা সময়েই মনে হয়েছে, স্পেন যা চাইছে, মাঠে ঠিক সেটাই ঘটছে।

    ২০১০ সালের পর আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল স্পেন। ১৬ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। এ বারও সেই স্বপ্নের খুব কাছে পৌঁছে গেল স্প্যানিশরা। আর মাত্র একটি জয়। তার পরই আবার বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে বসার সুযোগ। ফ্রান্সকে সরিয়ে সেই স্বপ্নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল স্পেন।

    শুরুতেই পেনাল্টি থেকে গোলে এগিয়ে যায় স্পেন

    ম্যাচের ২০ মিনিটেই বড় সুযোগ এসে যায় স্পেনের সামনে। লুকাস দিগনে (Lucas Digne) বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুল করে বসেন। প্রথমে বলটি তাঁর মাথা ছুঁয়ে পিছনের ফাঁকা জায়গায় চলে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফের বলটি ক্লিয়ার করতে যান তিনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে পিছন দিক থেকে বলের দখল নিতে ঢুকে পড়েছিলেন লামিনে ইয়ামাল। বলে পৌঁছনোর আগেই দিগনের বুট ইয়ামালের গায়ে লাগে। ফলে কোনও দ্বিধা না করেই পেনাল্টির নির্দেশ দেন রেফারি।

    এই ঘটনায় দিগনে হতাশ হয়ে পড়ে। তবে কিলিয়ান এমবাপে দাবি করেন, বল লামিনে ইয়ামালের হাতে লেগেছে। কিন্তু বলটি হাতার অংশে লেগেছিল। তাই পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বদল হয়নি। ২২ মিনিটে ওয়ারজ়াবাল (Oyarzabal) পেনাল্টি থেকে গোল করতে কোনও ভুল করেননি। তিনি জোরালো শটে বলটি জালের ডানদিকে মাঝামাঝি উচ্চতায় মারেন। মাইক মাইগনান সঠিক দিকে ঝাঁপালেও বল আটকানোর কোনও সুযোগই পাননি। ১-০ এগিয়ে গেল স্পেন।

    ১-০ এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় স্পেন

    প্রথমার্ধে ভালো খেলারই সুফল পায় যায় স্পেন। বলের দখল ও খেলার নিয়ন্ত্রণ বেশির ভাগ সময়ই ছিল স্পেনের হাতে। ফ্রান্স কয়েক বার আক্রমণে উঠলেও বড় কোনও সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। স্পেনের রক্ষণও বেশ সংগঠিত। ফলে প্রথম ৪৫ মিনিট শেষে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় স্পেন।

    পেদ্রোর গোলে ব্যবধান বাড়ায় লা ফুয়েন্তের দল

    দ্বিতীয়ার্ধের খেলার রাশ নিজেদের হাতে রেখেছিল স্পেন। ফ্রান্সের ডিফেন্সকে এ দিন অত্যন্ত সাদামাটা লেগেছে। কোনও দাপটই দেখাতে পারেননি দিদিয়ের দেশঁ দলের ডিফেন্ডাররা। আর ফ্রান্সের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ম্যাচের ৫৭ মিনিটে স্পেন ব্যবধান দ্বিগুণ করে ফ্রান্সকে আরও চাপে ফেলে।

    মাঝমাঠে বল পেয়ে আক্রমণে ওঠেন দানি ওলমো (Dani Olmo)। সরাসরি থ্রু বল না খেলে তিনি দ্রুত দিক বদলে আক্রমণের গতি বাড়ান। এর পর ডান প্রান্তে উঠে আসা পেদ্রো পোরো (Pedro Porro) ওলমোর সঙ্গে ওয়ান-টু পাস খেলে ফ্রান্সের রক্ষণ ভেঙে বক্সে ঢুকে পড়েন। সঠিক সময়ে স্পেস তৈরি করে কয়েকটি নিয়ন্ত্রিত টাচ নেওয়ার পর ডান পায়ের নিচু শটে গোলরক্ষক মাইক মাইগনানকে পরাস্ত করেন তিনি।

    দুর্দান্ত বিল্ড-আপ, দ্রুত পজিশনাল রোটেশন ও নিখুঁত কম্বিনেশন প্লে থেকে আসে স্পেনের দ্বিতীয় গোল। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বড় চাপে পড়ে যায় ফ্রান্স। এর পর আক্রমণে গতি ও সৃজনশীলতা বাড়াতে ব্র্যাডলি বারকোলার পরিবর্তে দেজিরে দুয়েকে (Desire Doue) মাঠে নামান দিদিয়ের দেশঁ (Didier Deschamps)।

    ফ্রান্স এ দিন বড় বেশি ছন্দহীন। অন্যদিকে ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের গতি ও ছন্দ পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় স্পেন। ছোট ছোট পাস, পজিশনাল রোটেশন এবং বলের দখল ধরে রেখে ফরাসি রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলে তারা। আক্রমণ ও মাঝমাঠ— দুই বিভাগেই স্পেন ছিল অনেক বেশি সংগঠিত, আর ফ্রান্সকে দেখাচ্ছিল দিশাহারা।

    গোল বাতিল স্পেনের

    এমন কী ৬১ মিনিটে প্রায় তৃতীয় গোল পেয়ে গিয়েছিল স্পেন। ডান প্রান্তে বল পেয়ে লামিনে ইয়ামাল (Lamine Yamal) গতি ও স্কিলের মিশেলে বক্সে ঢুকে বাঁ-পায়ের নিখুঁত কার্লিং শটে বল জালে জড়ান। তবে সহকারী রেফারির অফসাইড পতাকা ফ্রান্সকে বড় বিপদ থেকে বাঁচায়।

    এই ঘটনার পরে ইয়ামাল আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। লুকাস দিগনেকে (Lucas Digne) সহজেই কাটিয়ে তিনি আবারও স্পেনের আক্রমণের গতি বাড়ান। ফরাসি রক্ষণ তখন একেবারে দিশেহারা। স্পেনের দ্রুত পাসিং ও মুভমেন্ট সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিল তারা। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে হতাশ মুখে সব দেখছিলেন ফ্রান্সের কোচ দেশঁ।

    ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন

    কৌশলগত ভাবে প্রায় নিখুঁত ফুটবল খেলেই ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিল স্পেন। পুরো ম্যাচ জুড়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের (Luis de la Fuente) দল বলের দখল, পজিশনিং, প্রেসিং এবং ট্রানজিশন— প্রতিটি বিভাগেই প্রতিপক্ষের উপর আধিপত্য দেখিয়েছে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে স্পেন বারবার ফ্রান্সের রক্ষণে চাপ তৈরি করেছে।

    এ দিকে স্পেনের সুসংগঠিত রক্ষণ ও কার্যকর মিড-ব্লকের সামনে কিলিয়ান এমবাপে, মাইকেল ওলিসে, ওউসমান দেম্বেলে, দেজিরে দুয়ে এবং ব্র্যাডলি বারকোলা নিজেদের প্রভাব ফেলতে পারেননি। ফ্রান্সের স্ট্রাইকারদের স্পেস না দিয়ে এবং পাসিং লেন বন্ধ রেখে বিপক্ষের বেশির ভাগ আক্রমণ নষ্ট করে দেয় স্প্যানিশরা। ফলে পুরো ম্যাচে খুব কম সংখ্যক গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারে ফ্রান্স।

    অন্যদিকে বল পায়ে রেখে ধৈর্যের সঙ্গে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করেছে স্পেন। ছোট ছোট পাস, দ্রুত পজিশন পরিবর্তন এবং উইং ব্যবহার করে তারা ধারাবাহিক ভাবে ফ্রান্সের রক্ষণে চাপ তৈরি করে গিয়েছে। সব মিলিয়ে ট্যাকটিক্যাল গেম খেলেছে তারা। বলের দখল এবং দলগত সমন্বয়ের এক দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা থেকে আর মাত্র এক ধাপ দূরে পৌঁছে গেল স্পেন।

    এর আগে ২০১০ সালের শেষ বার ফাইনালে উঠেছিল তারা। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসকে (Netherlands) হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। এর পর দীর্ঘ ১৬ বছর অপেক্ষা। অবশেষে আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালের মঞ্চে ফিরল স্প্যানিশরা। এখন প্রশ্ন একটাই— ২০১০ সালের সেই সোনালি স্মৃতির পুনরাবৃত্তি কি হবে ২০২৬-এও? সেই উত্তর লুকিয়ে রয়েছে ফাইনালের ৯০ মিনিটে।

    ফ্রান্সের একাদশে: মাইক মাইগনান, জুলেস কুন্দে, দায়োত উপামেকানো, উইলিয়াম সালিবা, লুকাস দিগনে, অরেলিয়েঁ তুয়ামেনি, আদ্রিয়ান রাবিও, ওউসমানে দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা, কিলিয়ান এমবাপে (অধিনায়ক)।

    স্পেনের একাদশ: উনাই সিমন, পেদ্রো পোরো, পাউ কুবার্সি, এমেরিক লাপোর্তে, মার্ক কুকুরেয়া, রদ্রি (অধিনায়ক), ফাবিয়ান রুইজ়, লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো, আলেক্স বায়েনা, মিকেল ওয়ারজ়াবাল।
  • Link to this news (এই সময়)