• নবাবি আমলের ঐতিহ্য মেনে আজও রুপোর রথের চড়ে যাত্রায় বের হন জগন্নাথ
    এই সময় | ১৫ জুলাই ২০২৬
  • নবাবি আমলে শুরু হয়েছিল এই রথযাত্রা। ঐতিহ্য মেনে আজও সেখানে চলে পাঁচটি রথ। এর মধ্যে দু'টি পিতলের এবং একটি রুপোর। এই রথে চেপেই শোভাযাত্রায় বের হয় নিমকাঠের জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ। লালবাগের নসিপুর আখড়ার এই বহুরথের ঐতিহ্য পশ্চিমবঙ্গে বিরল বলেই বিবেচিত।

    আষাঢ় মাসের শুক্ল দ্বিতীয়ায় লালবাগের নসিপুর আখড়ায় শুরু হয় এক প্রাচীন ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ। জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথযাত্রাকে ঘিরে আজও ভক্তদের ঢল নামে আখড়া প্রাঙ্গণে। মুর্শিদাবাদের রথযাত্রার ইতিহাসে নসিপুর আখড়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ এটি রাজবাড়ির আড়ম্বরের পরিবর্তে বৈষ্ণব আখড়া-সংস্কৃতির ধারাকে বহন করে চলেছে। এখানে এই রথ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বৈষ্ণব সাধনা, আখড়া-সংস্কৃতি এবং নবাবি আমলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারক।

    জানা গিয়েছে, ১৭৬১-৬২ সালে স্বামী রামানুজ-পরম্পরার বৈষ্ণব সাধক লছমন দাস ও মনসরাম দাস মুর্শিদাবাদে এসে নসিপুরে একটি আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকার উর্দু বাজার থেকে এসে মীরজাফরের আদি বাড়ির লাগোয়া স্থানে এই আখড়া তৈরি করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এখান থেকেই রথযাত্রার সূচনা হয়। প্রথম দিকে এই আখড়ার মহন্ত চতুর্ভুজ দাস আচার্য দু'টি কাঠের রথ নির্মাণ করে রথযাত্রা শুরু করেন। পরে, ১৭৮৮ সাল নাগাদ, মহন্ত গোপাল দাস আচার্যের সময়ে দু'টি পিতলের রথ সংযোজিত হয়। এর পরে, ১৮২৫ সালে, মহন্ত ভগবান দাস আচার্যের সময়ে, রাজস্থান থেকে কারিগর এনে তৈরি করা হয় বিখ্যাত রুপোর রথ। এই রথই আজ নসিপুর আখড়ার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত।

    লালবাগ নসিপুর জাফরাগঞ্জ আখড়ার বর্তমান সেবাইত মহন্ত রাঘব দাস আচারি জানান, নবাব মীরজাফরের সময় কাঠের রথ দিয়ে এর সূচনা হয়েছিল। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় পিতল এবং রুপোর রথ।

    সেই সঙ্গে ওই আখড়া সূত্রে জানা গিয়েছে, নবাবি যুগে রথযাত্রার দিন আখড়া থেকে রথ যেত জগৎ শেঠ পরিবারের বাড়িত। সেখানেই ‘মাসির বাড়ি’-তে সাত দিন থাকার পরে আবার আখড়ায় ফিরে আসত দেববিগ্রহ। স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে, রুপোর রথটি এক সময় হাতির সাহায্যে টানা হতো।

    তবে নসিপুর আখড়ার রথ উৎসবের মূল কেন্দ্র জগন্নাথদেবের ভক্তি, হরিনাম সংকীর্তন এবং বৈষ্ণব আচার। ইতিহাসবিদদের মতে, কাশিমবাজার রাজবাড়ি, নশিপুর রাজবাড়ি, লালগোলা রাজবাড়ি এবং বিভিন্ন আখড়া ও মঠে রথোৎসবের প্রচলন সেই ধারারই অংশ। নসিপুর আখড়া সেই ঐতিহ্যকে আজও জীবিত রেখেছে।

    এই রথযাত্রা দেখতে আজও নসিপুর রাজবাড়ি সংলগ্ন এলাকায় এবং মেলায় প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে।রূপোর রথটি বের করার সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়তি সুরক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়।

  • Link to this news (এই সময়)