• সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই টেন্ডারে কারচুপি! বরাত কাজল ঘনিষ্ঠদেরই
    বর্তমান | ১৫ জুলাই ২০২৬
  • পিনাকী ধোলে, সিউড়ি:  এক লক্ষ বা তার বেশি টাকার সরকারি কাজে স্বচ্ছতা আনতে অনলাইনে দরপত্র বা ‘ই-টেন্ডার’ বাধ্যতামূলক করেছে রাজ্য। কিন্তু সেই নিয়মের ফাঁক গলেই কীভাবে একের পর এক বেনিয়ম চলেছে বীরভূম জেলা পরিষদে, তারই পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যতালাশ করছেন দিল্লির অডিট কর্তারা। সোমবারের পর মঙ্গলবারও জেলা পরিষদের একের পর এক ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করতেই তাজ্জব তদন্তকারীরা। তিন বা তারও বেশি ঠিকাদার অংশ নেওয়া সত্ত্বেও মাত্র এক শতাংশের কম ছাড়ে কীভাবে কোটি কোটি টাকার বরাত পাইয়ে দেওয়া হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইন্ডিয়ান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের পশ্চিমবঙ্গ শাখার তিন প্রতিনিধি। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, প্রতিযোগিতা তো দূরের কথা, কৌশলে ছক কষেই গুটিকয়েক ঠিকাদারকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পাইকারি হারে সরকারি কাজের বরাত দেওয়া হয়েছে।  

    জেলা পরিষদ সূত্রের খবর, পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত খরচের হিসাব মেলাতে আসা অডিট টিমের সদস্যরা জেলা পরিষদের টেন্ডার সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখতে গিয়ে চরম স্বজনপোষণের গন্ধ পেয়েছেন। জেলা পরিষদ সূত্রের খবর, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নামকাওয়াস্তে একাধিক ঠিকাদার দরপত্র জমা দিলেও আড়ালে চলত নিখুঁত ‘সেটিং’। যার জেরে কোনো বাস্তব প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ পেয়ে যেতেন নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি। যাঁরা প্রত্যেকেই জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা নিকটাত্মীয় বলে গুঞ্জন রয়েছে নানা মহলে। যেমন, গত মার্চ মাসে নানুরের চারকলগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি কমিউনিটি টয়লেট ও সাবমার্সিবল পাম্প তৈরির জন্য ১৬ লক্ষ ৫৪ হাজার ৫৩৫ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। সেখানে দেখা যাচ্ছে, এক ঠিকাদার মাত্র ০.১৬ শতাংশ কম দর হাঁকিয়ে, অর্থাৎ ১৬ লক্ষ ৪২ হাজার টাকায় অনায়াসে কাজটি পকেটে পুরে নেন। একইভাবে চিনপাইয়ের আলম বাবার মাজারে একটি ড্রেন তৈরির জন্য ২৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ৭৪৫ টাকা বরাদ্দ হয়। সেখানেও মাত্র ১.৩৩ শতাংশ কম দরে ২৪ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকায় কাজের বরাত পেয়ে যান অন্য এক ঠিকাদার। কাকতালীয়ভাবে, এই দুই ঠিকাদারই সভাধিপতির ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষ বলে জোর চর্চা চলছে। শুধু তাই নয়, দেখা যাচ্ছে বহুক্ষেত্রেই ১ শতাংশের কম দরে কাজ পেয়েছেন কাজল ঘনিষ্ঠ ঠিকাদাররা। এ সবই এখন অডিট কর্তাদের নজরে। এই আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগে স্বভাবতই সুর চড়িয়েছে বিরোধী শিবির। বিজেপির জেলা সহ-সভাপতি দীপক দাস সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘কেন্দ্রের পাঠানো পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের কোটি কোটি টাকা স্রেফ নয়ছয় করা হয়েছে। সরকারকে টুপি পরিয়ে সাধারণ মানুষের উন্নয়নের টাকা সরাসরি নেতাদের পকেটে ঢুকেছে। এসব নিয়ে যাতে কেউ মুখ খুলতে না পারে তারজন্য জেলা পরিষদে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছিল। বহু ক্ষেত্রে কাজের ন্যূনতম গুণগত মানও বজায় রাখা হয়নি। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই এর নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছিলাম। এসব অভিযোগ অবশ্য আগেই উড়িয়ে দিয়েছেন সভাধিপতি কাজল শেখ। এদিন তিনি বলেছেন, ‘আমরা তো কাজের প্রস্তাব দিই মাত্র। কাজ তো করেন আধিকারিকরা। যদি কোনো অনিয়ম হয়, তার দায় বর্তায় তাঁদের উপরই।’  
  • Link to this news (বর্তমান)