যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় পাটনা হাইকোর্টের একটি বিতর্কিত রায় নিয়ে কড়া পদক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট। ধর্ষণ নিয়ে পাটনা হাইকোর্টের মন্তব্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ আদালত। সম্প্রতি হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের একটি রায়ে বলা হয়েছিল, কোনও নারীর স্তন স্পর্শ করা বা জোরপূর্বক তাঁর নিম্নাঙ্গের পোশাক (সালোয়ার) খোলার চেষ্টা করা ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ নয়, বরং এটি কেবল মহিলার শ্লীলতাহানি। সেই মন্তব্যেই ক্ষুব্ধ প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলার শুনানির সময়ে বিচারকদের আরও সংবেদনশীল হতে হবে এবং একইসঙ্গে এ নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা করা জরুরি। পাশাপাশি যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় বিচারকের সংবেদনশীলতা নিয়ে ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির (NJA) তৈরি করা রিপোর্ট দেশের সব আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী-র ডিভিশন বেঞ্চে পাটনার হাইকোর্টের ওই রায়ের বিষয়টি উত্থাপন করেন প্রবীণ আইনজীবী শোভা গুপ্ত। তিনি আদালতের নজরে আনেন, সম্প্রতি পাটনা হাইকোর্ট একটি মামলায় পর্যবেক্ষণ করেছে যে, কোনও মহিলার সালওয়ার খোলার চেষ্টা করা এবং তাঁর বুকে হাত দেওয়া বা স্তন চেপে ধরা ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ নয়, বরং তা ‘নারীর শ্লীলতাহানির’ অপরাধের মধ্যে পড়ে।
পাটনা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ শুনে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, ‘বিচারকদেরও গবেষণা করার দায়িত্ব রয়েছে। আদালতের কর্মীরা সবসময়ে সেই কাজ করে দেবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।’ তিনি জানতে চান, যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলায় বিচারকদের সংবেদনশীল হওয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশ এবং NJA-র রিপোর্টটি পাটনা হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট রায়ে আদৌ বিবেচনা করা হয়েছিল কি না।
আইনজীবী শোভা গুপ্তা শীর্ষ আদালতকে জানান, ‘দুর্ভাগ্যবশত এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করার পরেও অতি সম্প্রতি পাটনা হাইকোর্ট একই ধরনের ঘটনা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এমন একটি রায় দিয়েছে। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে এই ধরনের অসংবেদনশীল রায় প্রায়শই সামনে আসছে।’ এর জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দুঃখপ্রকাশ করে বলেন,‘রায় দেওয়ার আগে বিচারকদের মধ্যে পুঙ্খানুপুঙ্খ আইনি গবেষণার বড় রকমের অভাব দেখা যাচ্ছে।’ শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা পাটনা হাইকোর্টের এই রায়ের বিষয়ে একটি বিস্তারিত ও কড়া নির্দেশিকা জারি করবে।
এর পরে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত, চার্জশিট এবং বিচার প্রক্রিয়ায় NJA-র হ্যান্ডবুক ও সুপারিশ অনুসরণ করতে হবে। শুধু সুপ্রিম কোর্ট নয়, দেশের সমস্ত হাইকোর্টের ওয়েবসাইটেও এই রিপোর্ট আপলোড করতে হবে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারগুলিকেও সব থানায় এই নির্দেশিকা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে FIR নথিভুক্ত করা এবং তদন্তের সময়ে নির্ধারিত নীতিমালা মেনে চলা হয়।
গত ৯ জুলাই পাটনা হাইকোর্টের বিচারপতি পূর্ণেন্দু সিং ২০০৮ সালের একটি যৌন নির্যাতন মামলার রায় পুনর্বিবেচনা করতে গিয়ে অভিযুক্ত হিমাংশুকুমার পাঠকের সাজা মকুব করেন। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ খারিজ করে। ২০১৩ সালে একটি নিম্ন আদালত ওই অভিযুক্তকে ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩৭৬ ধারার সঙ্গে ৫১১ ধারা (ধর্ষণের চেষ্টা) এবং ৩৪২ ধারায় (অন্যায়ভাবে আটকে রাখা) দোষী সাব্যস্ত করে ৩ বছরের সশ্রম কারাবাসের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই সাজা খারিজ হয়ে যায়।
আদালত জানায়, অভিযোগ অনুযায়ী অভিযুক্ত ফটোগ্রাফি স্টুডিয়োর ভিতরে তরুণীর সালওয়ার খোলার চেষ্টা করেন এবং তাঁর বুকে হাত দেন। কিন্তু ধর্ষণের উদ্দেশ্যে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ বা পেনিট্রেশনের কোনও প্রমাণ না থাকায় এটিকে ধর্ষণের চেষ্টা বলা যায় না। আদালতের মতে, এই ঘটনায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারায় শ্লীলতাহানির অপরাধ প্রযোজ্য হতে পারে। সেই কারণেই নিম্ন আদালতের ধর্ষণের চেষ্টার সাজা বাতিল করে দেওয়া হয়।
পাটনা হাই কোর্ট একটি রায়ে বলেছিল, কোনও মহিলার সালোয়ার খুলে দেওয়া ও স্তনে চাপ দেওয়া মাত্রেই 'ধর্ষণের চেষ্টা' প্রমাণিত হয় না; এটি শ্লীলতাহানির অপরাধ হতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট বিচারকদের সংবেদনশীলতা ও প্রাসঙ্গিক আইনি নজির সম্পর্কে সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে।
তবে এই পর্যবেক্ষণ প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। সেই প্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্ট বিচারক ও বিচারপতিদের সংবেদনশীলতার বিষয়টি পুনরায় সামনে এনে বিচারক ও বিচারপতিদের গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং যৌন অপরাধ সংক্রান্ত আইন প্রয়োগে আরও সতর্ক থাকার বার্তা দিল।
FAQ
কারণ আদালত বলেছিল, নির্দিষ্ট কিছু কাজকে শুধুমাত্র সেই ভিত্তিতে 'ধর্ষণের চেষ্টা' বলা যাবে না। এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে আইনজীবী ও বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়।
বিচারকদের জন্য যৌন অপরাধ সংক্রান্ত সংবেদনশীলতা বিষয়ক হ্যান্ডবুক ও রিপোর্ট প্রকাশ এবং তা অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে।
এই রিপোর্টে যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলায় বিচারিক সংবেদনশীলতা, ভাষা এবং আইনি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সুপারিশ রয়েছে।
বর্তমান শুনানিতে মূলত আদালত বিচারিক সংবেদনশীলতা ও নির্দেশিকা বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে। সংবাদে রায় বাতিলের কথা উল্লেখ নেই। যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলায় বিচারিক সংবেদনশীলতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতের বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে, এ ধরনের মামলায় প্রাসঙ্গিক আইন, নজির এবং সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।