এই সময়: বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পরে তৃণমূলের একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান ভয়ে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। কেউ আবার দুর্নীতির অভিযোগে জেলে। এরপরেও যাঁরা পদ ছাড়েননি তাঁদের একটা বড় অংশই পঞ্চায়েত অফিসে আসছেন না। এক কথায়, তাঁদের ‘নিখোঁজ’ বলা যেতে পারে। রাজ্যের প্রায় প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে।
ফলে জেলায় জেলায় গ্রাম পঞ্চায়েতকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে। বর্তমান আইনে আর্থিক লেনদেনের প্রশাসনিক ক্ষমতা রয়েছে পঞ্চায়েত প্রধানদের হাতে। পঞ্চায়েত সচিবের সঙ্গে যৌথ ভাবে টাকা খরচ করেন তাঁরা। ফলে ওই কাজও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অচল হয়ে পড়েছে রাজ্যের প্রায় সব পঞ্চায়েত অফিস। গ্রামীণ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে মনরেগার বদলে ১২৫ দিনের গ্রামীণ কর্মসংস্থানে ‘বিকশিত ভারত জি রামজি’ কর্মসূচির জন্য কেন্দ্রীয় বরাদ্দ এসেছে। রাজ্যে ৩,৩৩৯টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে প্রায় ২,৯০০ টিতে প্রধানকে খুঁজে না পাওয়ায় সেই কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন রাজ্যের পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘বর্তমান আইন অনুযায়ী পঞ্চায়েত প্রধানদের হাতেই আর্থিক ক্ষমতা। আর তার জেরেই পঞ্চায়েত প্রধানদের অনুপস্থিতিতে এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে।’ তাই বিধানসভার আসন্ন অধিবেশনে পঞ্চায়েত আইনে সংশোধন করে পঞ্চায়েত প্রধানের আর্থিক ক্ষমতা কেড়ে নিতে চান মন্ত্রী। একই সঙ্গে কিছু পঞ্চায়েত ও ব্লকের পুর্নগঠন চান। তাঁর কথায়, ‘পঞ্চায়েতগুলিতে কর্মী নেই, প্রধানরা পালিয়ে গিয়েছেন। তাঁদের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বিল বা অন্যান্য আর্থিক ক্ষেত্রে প্রধানদের যে ক্ষমতা আছে, সেটা আমরা কেড়ে নেব। তাঁরা যে বিলে সই করেন সে কারণে দুর্নীতি হয়। এঁদের হাত থেকে ক্ষমতা নিয়ে সরকারি অফিসারদের হাতে দেওয়া হবে, যেটা অন্যান্য রাজ্যে রয়েছে।’
নবান্ন সূত্রের খবর, ১ জুলাই থেকে এই প্রকল্প রূপায়ণের কাজ শুরু হওয়ার কথা। দার্জিলিং, কালিম্পং জেলায় বিভি জি রামজি এখনও শুরুই হয়নি। মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, দক্ষিণ দিনাজপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া জেলাতেও বেশিরভাগ গ্রাম পঞ্চায়েতে একই চিত্র। পুরুলিয়ার ১৭০টি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান অফিসেই আসছেন না। মনরেগা গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পে জবকার্ড নিয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। যে কারণে ২০২২–এর মার্চ থেকে পশ্চিমবঙ্গকে এই প্রকল্পের টাকা বরাদ্দ বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। তাই রাজ্যের নতুন সরকার ‘বিভি জি রামজি’ প্রকল্প নিয়ে প্রথম থেকেই সতর্ক। দুর্নীতি মোকাবিলায় প্রতিটি জবকার্ড যাচাই প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মঙ্গলবার জানান, ইতিমধ্যেই ২ কোটি ৫৬ লক্ষ জবকার্ড যাচাই করা হয়েছে।
‘বিকশিত ভারত জি রামজি’ কর্মসূচির অধীনে গ্রামীণ কর্মসংস্থানে আমূল বদল আনা হয়েছে। বেড়েছে মজুরিও। অদক্ষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে দৈনিক ৩০০ টাকা, আধা-দক্ষদের ৩৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫০ টাকা এবং দক্ষ শ্রমিকদের মজুরি ৫২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করা হয়েছে। মঙ্গলবার নবান্ন সভাঘরে মুখ্যমন্ত্রী ও পঞ্চায়েত মন্ত্রীকে পাশে বসিয়ে কেন্দ্রীয় কৃষি ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান জানান, চলতি আর্থিক বছরে শুধু কেন্দ্রের বরাদ্দ ৮,৫০৮ কোটি টাকা। রাজ্যের অংশ মিলিয়ে এই তহবিলের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২,০৬৪ কোটি ৫০ লক্ষ টাকায়।