• একাত্তরের ইতিহাসের সাক্ষী এখন মরণফাঁদ, যশোহর রোডে মরা গাছের আতঙ্ক দূর করতে মাইক হাতে পুলিশ
    এই সময় | ১৫ জুলাই ২০২৬
  • সৌমেন রায়চৌধুরী

    যশোহর রোড ধরে হাঁটছেন শ্বেতাঙ্গ এক সাহেব। পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি। উস্কোখুস্কো চুল। বিভ্রান্ত চোখমুখ। যা দেখছেন, ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। রাস্তা জুড়ে শরণার্থীর ঢল। মাথায়-কাঁধে পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে হেঁটে চলেছেন ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষ। পেছনে রয়ে গিয়েছে জ্বলন্ত গ্রাম, ভাঙা সংসার, পরিচিত উঠোন। আর তাঁদের উপরে ঝুঁকে পড়েছে যশোহর রোডের দু’ধারের ‘যত আদিম মহাদ্রুম’।

    প্রত্যেক ভাষার একটা নিজস্ব চলন রয়েছে। তার বোলচাল, অক্ষর-শব্দের উপরে জোর দেওয়ার ধরন, সবই আলাদা। একাত্তরের সেই গনগনে দিনে যশোহর রোড ঘুরে বেড়িয়েছেন আমেরিকান কবি-গীতিকার অ্যালেন গিন্সবার্গ। শরণার্থীদের হতশ্রী দশা নিয়ে লিখেছেন দীর্ঘ কবিতা। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোহর রোড’। অনেক পরে অ্যালেনের ইংরেজি কবিতার সেই চলনকে আশ্চর্য দক্ষতায় বাংলায় ধরেছিলেন মৌসুমি ভৌমিক, ‘কাদামাটি মাখা মানুষের দল/ গাদাগাদি হয়ে আকাশটা দেখে/ আকাশে বসত মরা ঈশ্বর/ নালিশ জানাবে ওরা বলো কাকে?’

    অ্যালেনের কবিতায় মানুষ আছে, খিদে আছে, কান্না আছে। মৌসুমির ভাবানুবাদেও সেই আর্তি অক্ষত। কিন্তু তাঁরা কেউই যশোহর রোডের গাছেদের কথা বলেননি। বলার কথাও নয়। লক্ষ লক্ষ অসহায়, নিরন্ন মানুষ আগে, না গাছ? ওই অভিমানেই কি না কে জানে, প্রাচীন সড়কের দু’পাশের শতবর্ষী বিশাল সব রেইনট্রি, শিরীষ, অশ্বত্থ, বট, মরে পচে গিয়েছে। শুধু মরণফাঁদ নিয়ে রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাদের কঙ্কাল।

    কলকাতা থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের পেট্রাপোল পর্যন্ত চলে গিয়েছে ঐতিহাসিক যশোহর রোড। তার দু’ধারে দাঁড়িয়ে প্রাচীন সব গাছ। অধিকাংশেরই ডাল শুকিয়ে গিয়েছে। কোথাও গোটা গাছটাই মৃত। উবুশ্রান্ত বৃষ্টি কিংবা দমকা হাওয়ায় তাসের ঘরের মতো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়তে পারে যে কোনও সময়ে। যে গাছগুলো একদিন উদ্বাস্তু মানুষের মাথার উপরে ছায়া দিয়েছিল, আজ তারাই আতঙ্কের কারণ।

    যশোহর রোডে ট্র্যাফিক সামলানোর পাশাপাশি তাই অন্য ভূমিকায় নামতে বাধ্য হয়েছে গাইঘাটা পুলিশ। হাতে মাইক। মুখে সতর্কবার্তা। পেট্রাপোল থেকে কুলপুকুর পর্যন্ত প্রায় ২১ কিলোমিটার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কোথাও পথচারীদের সাবধান করছেন তাঁরা, ‘শুকনো গাছের নীচে অযথা দাঁড়াবেন না।’ কখনও অটোচালকদের বলছেন, ‘যাত্রী তোলা-নামানোর আগে মাথার উপরে আশপাশে শুকনো গাছ আছে কি না একবার দেখে নেবেন।’

    এর পিছনে আছে গত কয়েক মাসের একাধিক দুর্ঘটনার স্মৃতি। কালুপুরে গাছের ডাল ভেঙে এক ব্যক্তি গুরুতর জখম হয়েছেন। সিকদারপল্লিতে তো প্রাণটাই চলে গিয়েছে এক যুবকের। চলন্ত অটোরিকশার উপরে গাছের মোটা ডাল ভেঙে বিপত্তি হয়েছে একাধিক বার। তছনছ হয়ে গিয়েছে দোকান। আহত হয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ী। তাই ঝঞ্ঝার মেঘ জমলেই আতঙ্ক ভিড় করছে যশোহর রোডে।

    শুকনো-মরা গাছগুলোর একটা স্থায়ী ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন না গাইঘাটা ট্র্যাফিকের ওসি রবিশঙ্কর ভৌমিক। চিন্তিত মুখে বললেন, ‘যতক্ষণ না গাছগুলোর একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা হচ্ছে, ততক্ষণ সাবধানে থাকতেই হবে। তাই মাইকিং।’ ধরমপুর আর কলাসিম বাজারের কাছে শুকনো গাছগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে বলে দাবি তাঁর।

    যশোহর রোড সম্প্রসারণের জন্য বারাসত থেকে বনগাঁ পর্যন্ত ৩০৫টি প্রাচীন গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকার। কিন্তু পরিবেশ কর্মীরা বেঁকে বসেন। মামলা গড়ায় আদালতে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট গাছ কাটার অনুমতি দেয় ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে শর্তও বেঁধে দেয়। আগে দেড় হাজার নতুন গাছ লাগাতে হবে। সেই আইনি আর প্রশাসনিক জটিলতায় মৃত-শুকনো গাছ সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার ধারে। অবাঞ্ছিতের মতো।

    যশোহর রোডের গাছ না কাটা যাচ্ছে, না ফেলা যাচ্ছে। একদিন যারা ইতিহাসের সাক্ষী ছিল, আজ তারাই আইনের লালফিতের ফাঁসে আটকে। আক্ষরিক অর্থে ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’ অবস্থা। পরিবেশপ্রেমী সুশান্ত দাস অনড়। চোয়াল শক্ত করে বলে দিলেন, ‘বিপজ্জনক আর শুকনো ডাল ছেঁটে, মৃত গাছ সরিয়ে, তার বদলে নতুন গাছ লাগাতে হবে। কেটে ফেলা কোনও সমাধান নয়।’ যশোহর রোডের ঐতিহ্য আর পরিবেশ তাঁর কাছে অগ্রাধিকার। একই মত ডঃ এপিজে আবদুল কালাম গভর্নমেন্ট কলেজের বটানির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর নিলয় কুমার মিত্রেরও। তিনি বলেন, ‘আগে গাছ লাগানো হোক। বড় গাছের ডালপালা ছাঁটা হলেও তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ, নতুন গাছ প্রাচীন বৃক্ষের মতো ফটোসিন্থেসিস করতে পারে না।'

    যশোহর রোডের গাছগুলোও এখন যেন শরণার্থী। মানুষের অনুমতির উপরে নির্ভর করছে তাদের বাঁচা-মরা। একেই বোধহয় 'আয়রনি' বলে। অথচ যশোহর রোডের গাছগুলোও তো সবাইকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল। ওই যেমন কবীর সুমন লিখেছিলেন, ‘গাছ তলাতে মানুষ থাকে, গাছের ডালে কাকের বাসা/ আমায় নিয়ে সবাই বাঁচুক, এটাই হলো গাছের আশা/ গাছ তলাতেই থেবড়ে বসা মেয়ের কোলে ছোট্ট ছেলে/ ময়লা আঁচল মুঠোয় ধরে গাছ দেখে সে দু’চোখ মেলে...।’

  • Link to this news (এই সময়)