• 'কে পপ' প্রীতিতেই সর্বনাশ, নাবালিকার যা পরিণতি হল...
    আজকাল | ১৫ জুলাই ২০২৬
  • দীক্ষা ভুঁইয়া: জুলজুলে চোখ তাকিয়ে ছিল ওইদিকেই। ওই যেদিকে নজর ঘুরিয়ে দিয়েছিল স্মার্ট ফোন। একসময় ছোটবেলায় নীলকমল-লালকমল বা পরবর্তীতে হ্যারি পটারের হগওয়ার্ডস যেমন নয়নের মনি ছিল টিনএজারদের, তেমনই একুশ শতকে টিনএজকে ঘিরে ধরেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি। 'কে-পপ', মানে কোরিয়ার পপুলার অর্থাৎ জনপ্রিয় সংস্কৃতি এখন ধমনীতে নীল রক্ত হয়ে বইছে প্রজন্মের। আর তাতেই হচ্ছে সর্বনাশ। না, মুম্বইয়ে নায়িকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাচারের ঘটনা নয়, এবার দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ডের হয়ে কাজ করিয়ে দেওয়ার নাম করে পাচার করে দেওয়া হচ্ছিল ১২ বছরের নাবালিকাদের। আর তাদেরই উদ্ধার করল পুলিশ।  

    একটি মোবাইল। একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। সাত মাসের পরিকল্পনা। আর কোরিয়ান পপ তারকা হওয়ার স্বপ্ন। এই স্বপ্নকেই হাতিয়ার করে কি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র দুই ১২ বছরের নাবালিকাকে দেশছাড়া করার ছক কষেছিল? মালদহ পুলিশের হাতে উঠে আসা ঘটনায় সেই আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে প্রবল।

    মঙ্গলবার গভীর রাত। সময় প্রায় ১১টা। শিলিগুড়ি বাসস্ট্যান্ডে নেমে দুই নাবালিকা কারও জন্য অপেক্ষা করছিল। পরিকল্পনা ছিল, কলকাতা থেকে আরও চারজন এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেবে। তারপর জয়গাঁও সীমান্ত পেরিয়ে ভুটান, সেখান থেকে দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু সেই পরিকল্পনায় শেষ মুহূর্তে জল ঢেলে দেয় মালদহ পুলিশের তৎপরতা।

    পুলিশ সূত্রে খবর, আগেই গোপন সূত্রে তথ্য আসে যে মালদহের ইংরেজবাজার এলাকার দুই নাবালিকা শিলিগুড়িতে নামার পরই পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই খবরের ভিত্তিতে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন করা হয় বাসস্ট্যান্ডে। দুই নাবালিকা পৌঁছতেই তাদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

    উদ্ধারের পর পুলিশের জেরায় উঠে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। দুই নাবালিকা জানায়, প্রায় সাত মাস আগে একটি বিশেষ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে কলকাতার এক “দিদি” এবং বাংলাদেশের এক “দাদা”-র সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। সেই কলকাতার মহিলাই অনলাইনে তাদের কোরিয়ান ভাষা শেখানোর ব্যবস্থা করেন। লক্ষ্য ছিল একটাই— দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় 'কে পপ' ব্যান্ডে কাজের সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।

    স্বপ্নের ফাঁদ এতটাই নিখুঁতভাবে পাতা হয়েছিল যে, ১৩ জুলাই দুই নাবালিকা স্কুল থেকে বেরিয়ে সরাসরি মালদহে এসে বাসে চেপে শিলিগুড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। তাদের নিজেদের কোনও মোবাইল ফোনও ছিল না। বাড়ির ফোন ব্যবহার করেই সমস্ত যোগাযোগ এবং পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে জানতে পেরেছে পুলিশ।

    তদন্তকারীদের প্রশ্নের শেষ নেই। যদি সত্যিই দক্ষিণ কোরিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, তবে পাসপোর্ট কোথায়? ভিসার ব্যবস্থা কে করেছিল? ভুটানকে ট্রানজিট রুট হিসেবে কেন বেছে নেওয়া হয়েছিল? শিলিগুড়ি থেকে জয়গাঁও পর্যন্ত কারা নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল? কলকাতা থেকে আসার কথা বলা চার ব্যক্তি কারা?

    সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয়, দুই নাবালিকা মালদহ ছাড়ার পরই যোগাযোগকারী সেই কলকাতার “দিদি” নির্দিষ্ট সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। তদন্তকারীদের মতে, এটি একটি সুপরিকল্পিত অপারেশনের ইঙ্গিত।

    পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে প্রভাবিত করে অল্পবয়সি মেয়েদের আন্তর্জাতিক মানবপাচারের জালে ফেলার চেষ্টা করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, বাংলাদেশের এক ব্যক্তিও নিয়মিত দুই নাবালিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ফলে আন্তঃসীমান্ত যোগসূত্রের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্তকারীরা।

    ইতিমধ্যেই বিজেপি সাংসদ শ্রীরূপা চৌধুরী এবং ‘শক্তিবাহিনী’-র পক্ষ থেকে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। এরপর মালদহ পুলিশ সাইবার ক্রাইম থানার সাহায্যে ওই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং ডিজিটাল যোগাযোগের সূত্র খুঁজতে নেমেছে।

    গভীর রাতে পুলিশের সঙ্গে কথা বলে শ্রীরূপা চৌধুরী অভিভাবকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের উপর নজর রাখুন। একটি মোবাইল ফোনই যথেষ্ট। সোশ্যাল মিডিয়ার আড়ালে মানবপাচারের জাল অনেক গভীরে ছড়িয়ে রয়েছে।”

    তদন্তকারীদের আশঙ্কা, এটি শুধুমাত্র দুই নাবালিকাকে ঘিরে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিয়ার করে আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র নতুন কৌশলে কিশোরী ও নাবালিকাদের টার্গেট করছে। সেই চক্রের শিকড় কতটা গভীরে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত— এখন সেই উত্তরই খুঁজছে মালদহ পুলিশ।

     
  • Link to this news (আজকাল)