নদীর পাড়ে লোহার ফ্রেম। তা থেকে সার দিয়ে দড়ি ঝুলছে। নীচে কোমর সমান জলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আদিবাসী মহিলারা। গলায় সেই দড়ির ফাঁস। গণ-আত্মহত্যা করতে চলেছেন তাঁরা। মধ্যপ্রদেশের ছাতারপুরে কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে এ ভাবেই বিক্ষোভে নেমেছেন দৌধন, মাঝগাঁও, রুঞ্জ, পান্নার কয়েক হাজার আদিবাসী।
জল সঙ্কটে ভুগছে বুন্দেলখণ্ড। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, পানীয় জল ও সেচের সমস্যায় নাজেহাল স্থানীয় বাসিন্দারা। এর সমাধানে কেন নদীর অতিরিক্ত জল বেতওয়া নদীতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে মধ্যপ্রদেশ সরকার। এটাই কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্প। কিন্তু শুধু স্থানীয় বাসিন্দারা নয়, পরিবেশবিদ, সমাজকর্মীরাও প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতায় নেমেছেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রকল্পের ফলে হাজার হাজার পরিবার উচ্ছেদের মুখে পড়বেন। যে টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে, তা নতুন জীবন শুরু করার জন্য যথেষ্ট নয় মোটেই। সরকার বর্তমানে ১২.৫ লক্ষ টাকা দিচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা ২৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পুনর্বাসনের তালিকায় অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নাম নেই বলেও অভিযোগ তাঁদের।
প্রশাসন অবশ্য সব দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। তার পরে আন্দোলন স্থগিত রেখেছিলেন চার-পাঁচটি গ্রামের আদিবাসী এবং স্থানীয়রা। কিন্তু চলতি মাস থেকে ফের শুরু হয়েছে আন্দোলন। তাঁদের অভিযোগ, সব প্রতিশ্রুতি কথার কথা হয়েই রয়ে গিয়েছে। কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। তাই আবার নতুন করে কোমর বাঁধছেন তাঁরা। প্রতীকী ফাঁস লাগিয়ে কোমর জলে দাঁড়িয়ে তাঁরা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ‘ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ছাড়া পূর্বপুরুষের জমি অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো।’
২০২৩ সাল থেকেই প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। তবে চলতি বছরের এপ্রিলে ‘চিতা আন্দোলন’ নিয়ে দেশ জুড়ে চর্চা শুরু হয়। প্রকল্প এলাকার কাছে প্রতীকী চিতায় শুয়ে প্রতিবাদ জানান তাঁরা, শোরগোল পড়ে যায় গোটা দেশে। এর পর থেকে কখনও জল সত্যাগ্রহ অর্থাৎ কোমর জলে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ, কখনও মাটি সত্যাগ্রহ, কখনও অনশন চলছে। চলতি মাস থেকে শুরু হয়েছে গলায় প্রতীকী ফাঁস পরে প্রতিবাদ।
তবে সরকারের দাবি, কেন-বেতওয়া প্রকল্পের ফলে কোটি কোটি মানুষ জল ও সেচের সুবিধা পাবেন। পানীয় জলের সমস্যা মিটবে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রকল্পে দৌধন বাঁধ তৈরি হলে ২২টি গ্রাম জলমগ্ন হয়ে যাবে। ঘরছাড়া হবেন কয়েক হাজার মানুষ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ খতিয়ে দেখে নতুন করে সমীক্ষা চালিয়েছে মধ্যপ্রদেশ সরকার।
ছত্তরপুরের জেলাশাসক পার্থ জয়সওয়ালের কথায়, ‘সমীক্ষার পরে প্রায় ৭৫০টি পরিবারকে নতুন করে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়েছে।’ বাড়ানো হয়েছে ক্ষতিপূরণের অঙ্কও। মধ্যপ্রদেশ সরকার জানিয়েছে, প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ করা হয়েছে। পুনর্বাসনের অনুদান ৫ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১২.৫ লক্ষ টাকা। তবে এতেও সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারী। তাঁদের দাবি, এই লড়াই শুধু ক্ষতিপূরণের টাকার জন্য নয়। এটা তাঁদের জমি, জীবিকা, বন, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের পরিচয় রক্ষার আন্দোলন। উন্নয়নের নামে তাঁদের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিকে বলি দেওয়া চলবে না। তাঁরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, প্রকল্প স্থগিত না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।