কলকাতা, 15 জুলাই: ‘যদি মানুষ হয়ে না পারি, পাখি হয়েও ফিরব একদিন’, নিজের প্রিয় কলকাতা শহর ছাড়ার সময় আক্ষেপ করে এমনটাই লিখেছিলেন নির্বাসিত ও বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন ৷ দীর্ঘ প্রায় দু'দশক পর তাঁর সেই আক্ষেপ এবার ঘুচতে চলেছে ৷ আবার তিনি কলকাতায় আসতে চলেছেন ৷ আর তাঁর এই কলকাতায় ফেরা নিয়ে এখন সরগরম রাজ্য রাজনীতি ৷
উল্লেখ্য, 2007 সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রবল বিক্ষোভের জেরে কার্যত বাধ্য হয়েই কলকাতা ছেড়েছিলেন তসলিমা ৷ এরপর তৃণমূলের 15 বছরের শাসনেও তাঁর ফেরা সম্ভব হয়নি ৷ তবে রাজ্যে সম্প্রতি রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, আগামী অগস্ট মাসের শুরুতেই তিনি শহরে পা রাখতে চলেছেন ৷
তাঁর এই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হতেই রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলির মধ্যেও শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক ৷ কেউ এই ঘটনাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জয় হিসেবে দেখছেন, তো কেউ আবার এর মধ্যে মেরুকরণের রাজনীতির গন্ধ পাচ্ছেন ৷
তসলিমার এই সফরের মূল আয়োজক 'সেকুলার মিশন' নামের একটি সংগঠন ৷ আয়োজক সংস্থার চেয়ারম্যান ওসমান মল্লিকের দাবি, জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহেই ভারতে আসছেন তসলিমা ৷ কলকাতায় তিনি দু'দিন থাকবেন ৷ আগামী 3 অগস্ট তিনি শহর ছাড়বেন ৷ ওসমান মল্লিকের কথায়, ‘‘আমরা যখন ওঁর সম্মতি পাই, তখন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করি ৷ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হয়েছেন ৷ তিনি জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানে তিনিও উপস্থিত থাকবেন ৷ প্রয়োজনীয় সমস্ত নিরাপত্তা দেওয়া হবে ৷’’
জানা গিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, স্বপন দাশগুপ্তের মতো বিশিষ্টজনেরাও উপস্থিত থাকবেন ৷ আয়োজকদের মতে, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতিতে লেখকদের সবসময় সম্মান জানানো হয়েছে ৷ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করার স্বীকৃতি হিসেবেই তসলিমাকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে এবং তিনি একটি সাংবাদিক বৈঠকও করবেন বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা ৷
লেখিকার এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তীব্র রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে ৷ সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী এই ঘটনাকে বিজেপির রাজনৈতিক গিমিক বলে কটাক্ষ করেছেন ৷ তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, "তসলিমা নাসরিন ভারতবর্ষের নাগরিক নন ৷ বিজেপির কথা অনুযায়ী তিনি অনুপ্রবেশকারী হয়ে আবার না যান ! এসআইআর-এর তালিকায় কি তাঁর নাম পড়বে ?"
সুজনের দাবি, কোনও বিদেশি নাগরিক দেশে থাকবেন কি না, তা সম্পূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয় ৷ রাজ্যে ও কেন্দ্রে একই দলের সরকার থাকায় এটা সহজেই সম্ভব হচ্ছে ৷ এর সঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই ৷ অন্যদিকে, আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীও এই সফরের কড়া সমালোচনা করেছেন ৷ তাঁর মতে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কথা বলে সবসময় খবরের শিরোনামে থাকাই তসলিমার স্বভাব ৷ তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসাকেই এখন উন্নয়নের মোড়কে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন নওশাদ ৷
রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠনের তরফ থেকেও ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়েছে ৷ জামায়াতে ইসলামী হিন্দ-এর রাজ্য সভাপতি মসিহুর রহমান এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছেন ৷ তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাখ্যাত এক বিতর্কিত মানুষকে বছরের পর বছর ধরে ভারতে রাখা হয়েছে ৷ এই দেশে থেকে বিতর্ক সৃষ্টি করা এবং বিভাজনের রাজনীতি করার জন্যই তাঁকে দিল্লি থেকে কলকাতায় আনা হচ্ছে ৷’’
তিনি অভিযোগ করেন, এপার বাংলার বৈধ নাগরিক সোনালি-বিউটি বা চাকুলিয়ার জলিলকে যখন হেনস্তার শিকার হতে হয়, তখন ভিন দেশের একজন বিতর্কিত লেখিকাকে জামাই আদরে রাখা হচ্ছে ৷ মসিহুর রহমানের দাবি, বেকারত্ব, পরিযায়ী শ্রমিক বা স্বাস্থ্যের মতো জ্বলন্ত সমস্যাগুলি থেকে নজর ঘোরাতেই খামোখা এই ধরনের বিষয়কে ইস্যু করা হচ্ছে ৷
তবে এই তীব্র বিতর্কের মাঝেই কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা গিয়েছে প্রাক্তন আইপিএস তথা প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের গলায় ৷ একজন লেখক হিসেবে তিনি তসলিমার আসাকে স্বাগত জানিয়েছেন ৷ তিনি বলেন, ‘‘যে কোনও ব্যক্তির স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার আছে ৷ লেখকের লেখার নিজস্ব স্বাধীনতাও থাকা উচিত ৷’’ একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত লাগে এমন কিছু না বলাই বাঞ্ছনীয় ৷ তসলিমা শহরে এলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে বলে তিনি মনে করেন না ৷
হুমায়ুন কবীরের মতে, রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর সংখ্যালঘু সমাজ নিজেদের একাধিক বিষয় নিয়ে এমনিতেই চিন্তিত, তাই তসলিমাকে নিয়ে আলাদা করে মাথা ঘামানোর মতো সময় বা আগ্রহ তাঁদের নেই ৷ সব মিলিয়ে, দীর্ঘ কুড়ি বছর পর তসলিমার এই প্রত্যাবর্তন শহর কলকাতার রাজনীতিতে যে নতুন করে উত্তাপ বাড়িয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না ৷
প্রসঙ্গত, তসলিমাকে কলকাতায় ফেরানো নিয়ে কয়েকমাস আগে সরব হন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ৷ রাজ্যসভায় এই বিষয়ে বক্তব্য রাখেন ৷ কেন তসলিমাকে কলকাতায় আনা যাচ্ছে না, সেই নিয়ে প্রশ্ন করেন কেন্দ্রীয় সরকারকে ৷ পরে কেন্দ্রের তরফে শমীককে জানানো হয় যে ভারতের কোনও জায়গায় যেতে তসলিমার উপর কোনও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি ৷ অবশেষে তসলিমা নাসরিন কলকাতায় পা রাখতে চলেছেন ৷