• হাত দিয়ে ঝরঝর করে ঝরছে রক্ত, ৪০ মিনিট ধরে পুলিশের কাছে আর্জি জানিয়েও মিলল না সাহায্য, মৃত্যু যুবকের
    এই সময় | ১৬ জুলাই ২০২৬
  • রক্তে ভেসে যাচ্ছে হাত। প্রায় একটানা ৪০ মিনিট ধরে সাহায্যের আর্তি করেছিলেন ওই যুবক। তবু সাহায্যে এগিয়ে আসেনি খোদ পুলিশকর্মীরাই। এর জেরে মর্মান্তিক ভাবে প্রাণ হারালেন এক যুবক। অভিযোগ, উত্তরপ্রদেশের গাজ়িয়াবাদের এক দল মহিলা পুলিশকর্মীর চরম উদাসীনতা ও অসংবেদনশীলতার কারণেই ঘটেছে এমন মর্মান্তিক ঘটনা।

    ঘটনাটি ঘটেছে গাজ়িয়াবাদের মধুবন বাপুধাম থানা এলাকার সঞ্জয় নগরের একটি 'পিঙ্ক পুলিশ বুথ'-এর (মহিলা পুলিশ সহায়তা কেন্দ্র) সামনে। অভিযোগ, মারধরের হাত থেকে বাঁচতে পুলিশের কাছে সাহায্য চাইতে গেলেও বন্ধ বুথের দরজা খোলেননি কর্তব্যরত মহিলা পুলিশকর্মীরা। প্রায় ৪০ মিনিট ধরে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার পরে চরম হতাশায় বুথের কাচে ঘুষি মারেন ওই যুবক। কাচ ভেঙে তাঁর হাতের প্রধান শিরা কেটে যায়। সময়মতো সাহায্য না মেলায়, রাস্তায় ছটফট করতে করতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়েছে এক ২২ বছর বয়সি যুবকের।

    মৃত যুবকের নাম রাজ কুমার (২২), তিনি মূলত বিহারের সিওয়ানের বাসিন্দা এবং গাজ়িয়াবাদে গাড়ির মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত রবিবার (১২ জুলাই) দুপুরে একটি অটোয় ওঠার পরে ভাড়া নিয়ে অটোচালকের সঙ্গে রাজ কুমারের তীব্র বচসা শুরু হয়। ঝামেলা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে পৌঁছে যায়। অটোচালকের মারধরের হাত থেকে বাঁচতে এবং অভিযোগ জানাতে রাজ কুমার কাছের পিঙ্ক পুলিশ বুথের দিকে দৌড়ে যান।

    প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবারের দাবি, বুথটি ভিতর থেকে বন্ধ ছিল এবং ভিতরে দু'জন মহিলা কনস্টেবল উপস্থিত ছিলেন। রাজকুমার প্রায় ৪০ মিনিট ধরে দরজায় কড়া নেড়ে ও চিৎকার করে সাহায্যের জন্য আকুতি জানান। কিন্তু ভিতরে থাকা পুলিশকর্মীরা ভয় পেয়ে বা অন্য কোনও কারণে দরজা খোলেননি। এর পরে তীব্র রাগে ও হতাশায় রাজকুমার বুথের জানলার কাচে সজোরে আঘাত করেন। আঘাতের জেরে কাচ ভেঙে তাঁর হাতে গভীর ভাবে ঢুকে যায় এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে শুরু করে। ​গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি সাহায্যের জন্য আবেদন করতে করতেই রাস্তার মাঝখানে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন।

    এই ঘটনার পুরো ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে, যুবকটি রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। পুলিশকর্মী ও পথচারীরা দূর থেকে তাঁকে দেখছেন। সাহায্যের জন্য কেউই এগিয়ে আসেননি। সহকারী পুলিশ কমিশনার (ACP) উপাসনা পান্ডের দাবি, ওই সময়ে রাজ কুমার এবং অটোচালক দু'জনেই মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। বচসার পরে তাঁরা পিঙ্ক পুলিশ বুথের সামনে পৌঁছন। বুথের সামনে এসে রাগের মাথায় রাজ কুমার নিজেই বুথের গেটে আঘাত করে হাত কেটে ফেলেন।

    যদিও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বুথে থাকা মহিলা পুলিশকর্মীরা রাজ কুমারকে শুরুতেই পুরুষ পুলিশ রয়েছে এমন থানায় যেতে বলেন। এর পরে ক্ষুব্ধ রাজ কুমার বুথের লোহার দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন। পরে কাচের দরজায় জোরে আঘাত করলে, সেটি ভেঙে যায় এবং কাচ ভেঙে তাঁর হাতে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়। মুহূর্তের মধ্যেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। অভিযোগ, বুথে থাকা পুলিশকর্মীরা ভয় পেয়ে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন এবং বাইরে এসে কোনও সাহায্য করেননি।

    এদিকে পুলিশের দাবি, খবর পাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে টহলদারি পুলিশ এবং একটি অ্যাম্বুল্যান্স ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। এরপর তাঁকে উদ্ধার করে এমএমজি (MMG) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

    রাজকুমারের মা অভিযোগ করেছেন, মাত্র ২০ টাকা ভাড়া নিয়ে বিবাদের জেরে ঘটেছে এই মর্মান্তিক ঘটনা । রাজ কুমারের ভাই রীতেশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি মদ্যপ ছিলেন কি না তা এখন অবান্তর। একজন মানুষ যখন রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশের দোরগোড়ায় এসে সাহায্যের জন্য ভিক্ষা চাইছিল, তখন কি তাকে দ্রুত চিকিৎসা বা সাহায্য দেওয়া উচিত ছিল না?’ জানা গিয়েছে, মৃত যুবকের স্ত্রী বর্তমানে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

    পরিবারের দাবি, সময়মতো প্রাথমিক চিকিৎসা বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব ছিল। ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পরেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ। রাজ কুমারের আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীও দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

    অন্য দিকে, গাজ়িয়াবাদ পুলিশ জানিয়েছে, কাচ ভেঙে নিজের হাত গুরুতর ভাবে জখম হওয়ার পরই রাজ কুমারকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল এবং পুরো ঘটনার তদন্ত চলছে। কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে সিসিটিভি ফুটেজ ও ভাইরাল ভিডিয়োগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)