• সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড মহা-দ্বৈরথ: মাঠে ফুটবল, বুকে ফকল্যান্ডের ক্ষত! মারাদোনার অবাধ্য ইতিহাস কি ছুঁতে পারবেন মেসি?
    আজকাল | ১৫ জুলাই ২০২৬
  • সৌরভ গোস্বামী: বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে চলেছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা যখন শেষ চারে পা রাখল, তখন ফুটবল দুনিয়া আরও একবার নড়েচড়ে বসেছে এক চিরন্তন শত্রুতার ইতিহাসকে সামনে রেখে। ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি শান্তভাবে বলেছিলেন, "এটি কেবলই একটি ফুটবল ম্যাচ—তার বেশি কিছু নয়।" কিন্তু মাঠের বাইরের বাস্তবতা, মায়ামির রাস্তায় দুই দেশের সমর্থকদের হাতাহাতি কিংবা ড্রেসিংরুমে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের কণ্ঠে ‘মালভিনাস, দিয়েগো এবং মেসির শেষ বিশ্বকাপ’ নিয়ে তৈরি হওয়া উন্মাদনার স্লোগান বলছে সম্পূর্ণ অন্য কথা। স্কালোনির এই মন্তব্য আসলে ফুটবলীয় প্রতিভার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক শতাব্দী প্রাচীন রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী বারুদকে শান্ত করার এক মরিয়া চেষ্টা মাত্র, যা এই ম্যাচটিকে ঘিরে আটলান্টার নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে বাধ্য করেছে।

    খেলাধুলার দুনিয়ায় খুব কম দ্বৈরথই মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরে এতটা ভারী হয়ে ওঠে। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ডের এই লড়াই আসলে ফুটবল ম্যাচ নয়, এটি ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের এক রক্তাক্ত ক্ষতের জীবন্ত স্মারক। গ্যালারিতে যখন স্লোগান ওঠে ‘যে লাফায় না, সে ইংরেজ’, কিংবা যখন গালির সুরে উচ্চারিত হয় ‘ইংলা-পেরা’ শব্দবন্ধ, তখন ফুটবল এক লহমায় বদলে যায় ইতিহাসের প্রতিশোধের হাতিয়ারে। এই শত্রুতার প্রথম মহাকাব্যিক রূপ দেখা গিয়েছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো আরমান্দো মারাদোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অফ গড’ এবং শতাব্দীর সেরা গোলের মেলবন্ধনে। মারাদোনা, যিনি লাতিন আমেরিকার দরিদ্র মানুষের প্রতিনিধি এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এক অবাধ্য জাদুকর, পরবর্তীতে সেই বিতর্কিত গোলটিকে লঘু করে বলেছিলেন, "এটি ছিল এক চোরের পকেট থেকে চুরি করার মতো।" মারাদোনা ফুটবলার না হলে হয়তো চে গুয়েভারা বা ফিদেল কাস্ত্রোর মতো বিপ্লবী হতেন। তিনি তো স্পষ্টই বলতেন, "মালভিনার যুদ্ধে মৃতদের হয়ে খেলছিলাম আমরা, তাই মাঠে ওদের হারানো অত জরুরি ছিল।" আর তাই বারে বারে অবজ্ঞা দেখিয়েছিলেন থ্যাচার বা রানীর প্রতি। কাস্ত্রো, শ্যাভেজ, ইভো মোরালেসের প্রাণের দোস্ত এই ফুটবল জাদুকর মার্কিনীদের পুরস্কার নিতে অস্বীকার করে বুশকে যুদ্ধাপরাধী বলতে দ্বিধা করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, "মার্কিনদের বিরুদ্ধে নিজের দেশকে ফিদেল একা দাঁড়িয়ে দানবের মতো রক্ষা করেছিলেন, পাটা ছিল বটে বুকের! আমি ফিদেলের জন্য প্রাণ দিতে পারি। কিউবায় থাকা আর চে-র লেখা পড়তে পারাটা আমার ক্ষেত্রে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সব চাইতে শক্তিশালী বোমা পকেটে থাকলেই মানুষ শক্তিশালী হয় না।"

    আশ্চর্যের বিষয় হল, আজ আধুনিক ফুটবলের যুগে সেই চরম শত্রুতার ছবিটা কিছুটা বদলেছে। বর্তমান আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেস সহ পাঁচজন ফুটবলার খেলছেন খোদ ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগেই। মার্টিনেসের কথায়, "ইংলিশ দলের সতীর্থদের সঙ্গে খেলাটা আনন্দের।" কিন্তু বিশ্বমঞ্চে যখন জাতীয় পতাকার টান আসে, তখন এই পেশাদারিত্বের মোড়ক ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে ইতিহাসের সেই পুরনো জেদ। ১৯৮৬-র পর ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড এবং ডিয়েগো সিমিওনের সেই কুখ্যাত নাটকীয়তা—বিতর্ক পিছু ছাড়েনি কখনই। আসলে, উনিশ শতকে এই ব্রিটিশরাই যখন আর্জেন্টিনায় রেলপথ ও ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে এক ‘অনানুষ্ঠানিক সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলছিল, তখনই তারা বুয়েনস আইরেসে রোপণ করেছিল ফুটবলের বীজ। যে দেশ ফুটবল খেলাটা শিখিয়েছিল, আজ সেই দেশই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শত্রু।

    মারাদোনার সেই অবাধ্য, নির্ভীক জাতীয়তাবাদের উত্তরাধিকার আজ বইছেন লিওনেল মেসি। কেরিয়ারের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে মেসির জন্য কাপ জেতার এই শেষ লড়াইয়ে গোটা আর্জেন্টিনা দল ফকল্যান্ডের আবেগ বুকে নিয়ে মাঠে নামছে। আটটি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এমবাপের সাথে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছেন এলএম১০। এক অদ্ভুত সমাপতন, চার্লস ডারউইন তার বিখ্যাত সমুদ্রযাত্রার ডায়েরিতে আফসোস করে লিখেছিলেন, স্পেনের বদলে যদি ব্রিটিশরা আগে আর্জেন্টিনার নদী বেয়ে আসত, তবে কতই না উন্নত হতো এই অঞ্চল! ডারউইনের সেই আফসোসকে আজ উল্টে দিয়ে ফুটবল বিশ্ব প্রশ্ন করতে পারে—যদি ১৮৩৩ সালে ইংরেজরা ফকল্যান্ড দখল না করত, তবে কি মেসি ও মারাদোনার দেশের ফুটবলারদের এই মরণপণ লড়াইয়ের আবেগটা একই থাকত? ইতিহাস, রাজনীতি ও ক্রীড়াজগতের এই বিস্ফোরক মিশনেই আসন্ন সেমিফাইনালটি স্রেহ নব্বই মিনিটের খেলা রইল না, হয়ে উঠল এক ঐতিহাসিক রণাঙ্গন।
  • Link to this news (আজকাল)