রথযাত্রা যত এগিয়ে আসছে, ততই ভক্তি আর সৃজনশীলতার অনন্য মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে পূর্ব বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে। সেই তালিকায় এবার নজর কেড়েছেন পূর্ব বর্ধমান জেলার গুসকরা শহরের বাসিন্দা তথা রায় রামচন্দ্রপুর এন বি বিদ্যাপীঠের শিক্ষক তপন দাস। শিক্ষকতার পাশাপাশি শিল্পচর্চাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে আসা তপনবাবু এবার সম্পূর্ণ সুপারি ও সুপারি গাছের খোল ব্যবহার করে তৈরি করেছেন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার অভিনব মূর্তি। মূর্তি তৈরির মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে কার্ডবোর্ড দিয়ে।
তারওপর ব্যবহার করা হয়েছে সুপারি গাছের খোল এবং প্রায় এক কেজি সুপারি। পুরো কাজটি সম্পূর্ণ করতে তাঁর সময় লেগেছে টানা ৪৭ দিন। প্রতিদিন স্কুলের কাজ শেষ করে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন এই ব্যতিক্রমী সৃষ্টি। তপন দাস জানান, রথযাত্রা উপলক্ষে প্রতি বছরই তিনি নতুন কিছু করার চেষ্টা করেন। এর আগে তিনি বাতিল সামগ্রী দিয়ে পুরীর জগন্নাথ মন্দির ও কোনারকের সূর্য মন্দিরের প্রতিরূপ তৈরি করেছিলেন। আবার গামছা দিয়েও তৈরি করেছিলেন জগন্নাথের মূর্তি। সেই ধারাবাহিকতায় এবার তিনি বেছে নিয়েছেন সুপারি ও সুপারি গাছের খোল।
তাঁর কথায়, হিন্দু পূজায় সুপারির একটি বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। তাই সেই ভাবনা থেকেই সুপারিকে শিল্পের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি তৈরির পরিকল্পনা করেন। এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতেও তাঁকে প্রায় এক বছর সময় ব্যয় করতে হয়েছে। গুসকরা পিপি ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক ইমামুল হকের পাশাপাশি তাঁর ছাত্র-ছাত্রী এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও উপকরণ সংগ্রহে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদেরও পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান তিনি। শিক্ষক তপন দাস বলেন, “কাজ করতে আমার ভাল লাগে, আমি আগামী দিনেও এই ধরনের কাজ করব।”
শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজকের নয়। দীর্ঘ আট থেকে দশ বছর ধরে বিভিন্ন বাতিল ও প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে একের পর এক অভিনব শিল্পকর্ম তৈরি করে চলেছেন তপন দাস। সরস্বতী পুজো, কালীপুজো থেকে শুরু করে রথযাত্রা প্রতিটি উৎসবেই তিনি নতুন ভাবনার শিল্পকর্ম উপহার দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর আগে শুকনো কলাপাতা ও কলাগাছের ছাল দিয়ে মা কালীর প্রতিমা তৈরি করেও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।
তবে এত বছরের পরিশ্রমের পরও শিল্পী হিসেবে প্রাপ্য সম্মান এখনও পাননি বলে আক্ষেপ রয়েছে তাঁর। তপন দাসের আশা, তাঁর এই ধরনের পরিবেশবান্ধব ও ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম একদিন জাতীয় স্তরে পৌঁছাবে। তিনি চান, বাতিল বা সাধারণ উপকরণ দিয়েও যে অসাধারণ শিল্প সৃষ্টি সম্ভব, তা দেশের মানুষ দেখুক। একই সঙ্গে তাঁর কাজের মাধ্যমে পূর্ব বর্ধমান জেলার গুসকরা শহরের নামও সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই তাঁর স্বপ্ন।