এই সময়: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত ৪ মে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে গত দু’–আড়াই মাস ধারাবাহিক ভাবে কালীঘাটের পক্ষে দাঁড়িয়েই জোরালো ব্যাটিং করেছিলেন মদন মিত্র। একদা মমতার ছায়াসঙ্গী আচমকাই মঙ্গলবার রাতে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহার বাড়িতে তাঁর ছেলে, বিদ্রোহী শিবিরের নেতা সন্দীপন সাহার উপস্থিতিতে বৈঠক করেন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বুধবার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে কালীঘাটের ছত্রচ্ছায়া থেকে বেরিয়ে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন মদন।
বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আখরুজ্জামান, গোলাম রব্বানির উপস্থিতিতে বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেওয়ার আগে মমতাকে মঙ্গলবারই মেসেজ করে ‘সরি’ লিখেছেন মদন। কেন কালীঘাটের পাশ থেকে সরে বিদ্রোহী শিবিরে এলেন? এই প্রশ্নে বুধবার দিনভর মদন কখনও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কখনও একটি ভোটকুশলী সংস্থা, কখনও পরোক্ষে মমতাকে দুষেছেন। যদিও মমতা নিজে ফেসবুক লাইভে এ দিন বলেন, ‘আজ (বুধবার) এক জন চলে গিয়েছেন। আমার কোনও দুঃখ নেই। সে কাল (মঙ্গলবার) আমাকে মেসেজ দিয়ে বলেছিল, আমার পরিবারের সবাইকে সমন দিয়েছে। তখনই আমি বুঝে গিয়েছিলাম। তখনই তাঁকে সব পজি়শন থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম। মিথ্যে কথা বলে চতুরতা করার চেষ্টা করবেন না।’
কেন্দ্রীয় এজেন্সি ইডি ইতিমধ্যে পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় মদনের স্ত্রী এবং দুই ছেলেকে নোটিস পাঠিয়েছে। সেই চাপের মুখেই মদন তড়িঘড়ি শিবির বদল করেছেন বলে কালীঘাট শিবিরের দাবি। তৃণমূলনেত্রীর কথায়, ‘বলা হচ্ছে, সেটিং কোম্পানিতে নাম লেখান। না–হলে গাড়ি নিয়ে এসেছি, জেলে যান। না–হলে ছেলেমেয়েকে গ্রেপ্তার করব। পরিবারকে গ্রেপ্তার করব।...যাঁদের যেতে হয়, যান। যা পড়ে থাকবে, সেটা আমার সোনার খনি।’
যদিও ইডি–র সমনের জন্য তিনি শিবির বদলেছেন, এই অভিযোগ মানতে চাননি মদন। তৃণমূল জমানাতেই কেন্দ্রীয় এজেন্সি তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং তিনি জেলে ছিলেন বলে পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন পরিবহণ মন্ত্রী। ঋতব্রতদের হাত ধরার পরেই বুধবার বিকেলে বিদ্রোহী শিবিরের ২১ জুলাইয়ের প্রস্তুতি বৈঠকের এন্ট্রি পাস পেয়েছেন মদন।
১৯৯৮–এ মমতা তৃণমূল প্রতিষ্ঠা করার আগে থেকেই সুব্রত বক্সী, মদন মিত্র, মুকুল রায়, সোনালি গুহ, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকদের মতো একঝাঁক নেতা–নেত্রী মমতার আস্থাভাজনদের তালিকায় ছিলেন। এই টিমের মধ্যে একমাত্র সুব্রত বক্সী এখনও টিম টিম করে কালীঘাটের পাশে রয়েছেন। সোনালি পাঁচ বছর আগে বিজেপিতে যোগদান করার পরে এখন রাজনীতি থেকেই দূরে রয়েছেন। প্রয়াত হয়েছেন মুকুল। জ্যোতিপ্রিয়, ফিরহাদ হাকিম, অনুব্রত মণ্ডলরা বিদ্রোহী শিবিরে চলে গিয়েছেন। মদনের নিজের কথায়, ‘আমি দল বদল করিনি। আমি তৃণমূলে রয়েছি। শুধু ওই ঘর থেকে এই ঘরে এসেছি।’ বিধানসভার বিরোধী দলনেতার কক্ষে ঋতব্রত, সন্দীপন, আখরুজ্জামানের হাতে হাত রেখে মদন বলেছেন, ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস আজকে হলো সাথী। নতুন করে বদল আসছে। এই দল আরও বেশি মজবুত হবে।’
যদিও মমতা মনে করছেন, তথাকথিত এই নেতারা চলে গেলেও তিনি কর্মীদের নিয়ে ফের দলকে শক্তিশালী করবেন। ফেসবুক লাইভে মমতা বলেন, ‘২০০৪–এ একা থাকা অবস্থায় যদি নতুন করে শুরু করতে পারি, ১৯৯৮–এ যদি নতুন করে শুরু করতে পারি, ২০২৬–এও নতুন করে শুরু করার ক্ষমতা রাখি। আমার এই জোর আছে। এরা এখন সেটিং করে ওয়াশিং পাউডার হচ্ছে। আগে চোর ছিল, এখন সাধু পুরুষ!’ যদিও মদন মনে করছেন, অভিষেক থাকার ফলে মমতাও ঠিকঠাক কাজ করতে পারছেন না। বিধানসভা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে মদন বলেন, ‘আমি তো চুনোপুঁটি, উনি (অভিষেক) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাজ করতে দেননি।’ মদন বিদ্রোহী শিবিরে আসায় ঋতব্রত এ দিন বলেন, ‘অনুব্রত মণ্ডল হলেন আমাদের আর–৯ (রোনাল্দো) আর মদন মিত্র হলেন রোনাল্দিনহো।’