সায়নী জোয়ারদার
শেষ থেকে বহু শুরু হতে দেখেছে কলকাতা। এ বার দেখবে ১৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো, আইকনিক এবং হেরিটেজ ট্রামের ঘুরে দাঁড়ানোর ছবি। ১৮৭৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত যে ট্রাম চলেছিল প্রথমবারের জন্য, সেই ট্রামের ১৫০তম জন্মদিন পালিত হয় ২০২৩ সালে। সাহেবদের সময়ে ঘোড়ায় টানত যে গাড়ি, পরে তা বিদ্যুতে চলা শুরু করে। তিলোত্তমার বুক চিরে সরু লাইন, দুলতে দুলতে চলে কলকাতা। কত গল্প, কত মুহূর্ত, কত ভাঙাগড়ার সাক্ষী এই ট্রাম। যা গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে হারাতে বসেছিল কলকাতার বুক থেকে।
একটা সময়ে শহরে ৪০টির কাছাকাছি ট্রাম লাইন ছিল। এখন এসে ঠেকেছে দু’টিতে। গড়িয়াহাট থেকে পার্কসার্কাস, যা মল্লিকবাজার হয়ে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত চলে। যাকে ডাকা হয় ২৫ নম্বর রুট বলে। অন্যটি ৫ নম্বর রুট—শ্যামবাজার টু এসপ্ল্যানেড।
গত কয়েক বছরে হাজার দোষ ধরা হয়েছে এই ট্রামের। বলা হয়েছে, দিনভর ব্যস্ত শহরে দুলে দুলে ঘুরে বেড়ায় এ যান। তার জন্য যানজট হয়, দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ আয় হয় না। এ নিয়ে ২০২৩ সালে কলকাতা পুরসভার এক বৈঠকে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেছিলেন, ‘যে চারটি রুটে ট্রাম চলে, সে চারটি রুটে ট্রাম চলুক আমরাও চাই। বামফ্রন্ট আমল থেকে ২০ বছর ধরে বন্ধ আছে যেগুলো, সেগুলো খুব সরু রাস্তায়। যেমন নাখোদা মসজিদের সামনে দিয়ে সরু রাস্তা। সে সবে না চালানোই ভালো। খুব যানজট হয়। তাতে শহরের গতি স্লথ হয়ে যায়। আর পিছনে যে গাড়িগুলি থাকে ধোঁয়া ছাড়ে, দূষণের মাত্রা বাড়ে।’
তবে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখছে কলকাতা। রাজপথে আবারও ফিরবে ঐতিহ্যবাহী ট্রাম। একেবারে নতুন রূপে, নব কলেবরে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রূপ বদলাবে ট্রামের। ইতিমধ্যেই পরিষেবার রূপরেখা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে Rail India Technical and Economic Service (RITES)-কে। প্রাথমিক সমীক্ষা করে সরকারকে রিপোর্ট দিলেই তৈরি হবে ব্লু প্রিন্ট। পরিবেশবান্ধব এই ধীরগতির যানের কামব্যাককে কেন্দ্র করে মোটামুটি একটা ছক কষে ফেলেছে রাজ্যের পরিবহণ দপ্তর। আর বর্তমান রাজ্য সরকারের এ হেন উদ্যোগে এ বার আশাবাদী ক্যালকাতা ট্রাম ইউজ়ার্স অ্যাসোসিয়েশন।
স্বাধীনতার পরেও ব্রিটিশ কোম্পানির দায়িত্বে থাকা ট্রামের ভাড়া বাড়ানোর জন্য ১৯৫৩-এ সেকেন্ড ক্লাসের টিকিটের ভাড়া ১ পয়সা বাড়ানোর বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। শহরজুড়ে সংগঠিত হয় প্রতিবাদ, বিক্ষোভ। আন্দোলনের চাপে সরকার ভাড়াবৃদ্ধি নিয়ে কমিশন গঠন করার কথা ঘোষণা করে। শেষমেশ ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে ব্রিটিশ সংস্থাকে সরিয়ে ট্রামের জাতীয়করণ হয়।
কী পরিকল্পনা এ বার? পরিবহণ মন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের কথায়, ‘পুরোনো রুটে আবারও ট্রাম চলবে। সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর টু কালীঘাট। কারণ এটা আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে। আর রাজারহাট, নিউ টাউন, সল্টলেককে এক করা হবে এই ট্রামের পথ দিয়ে।’ অর্থাৎ রাজারহাট-নিউ টাউনেও এ বার চলবে ট্রাম। তবে এ বার আর ইলেকট্রিকে নয়, ট্রাম হবে ব্যাটারিচালিত। পরিবহণমন্ত্রীর কথায়, ‘একদম লেটেস্ট টেকনোলজি, তবে তৈরি হবে বাংলায়।’
অনেকের মতে, তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল ট্রাম। শিয়ালদহ থেকে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত (৩.৯ কিলোমিটার পথ) চলা প্রথম ট্রাম যাত্রী পরিবহণের জন্য ছিল না, পণ্য পরিবহণ করা হতো সেই রুটে। একটা বাক্স-কোচ, সামনে দু’টো ঘোড়া। এই ছিল ট্রামের রূপ। তবে লাভ হতো না বলে ৯ মাসের মধ্যে তা বন্ধও করে দেওয়া হয়।
এর পরে ১৮৮০ সালের ১ নভেম্বর যাত্রিবাহী ট্রামের পথচলা শুরু হয় কলকাতায়। তখন ভাইসরয় লর্ড রিপন। সেই ট্রামও ঘোড়াই টানত। পুরোনো অভ্যাসে সে সব ট্রামে অনেকে মালপত্তর তুলে ফেলতেন। আরও একটা কেলেঙ্কারি কাণ্ড ঘটত সে সময়ে। রাস্তাঘাটে ভিড় দেখে মাঝেমধ্যে বেপরোয়া ছুট লাগাত ঘোড়াগুলি। কোচম্যান তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে নাকানিচোবানি খেতেন। কখনও মাঝরাস্তায় উল্টে যেত কোচ।
১৯০২ সালের ২৭ মার্চ খিদিরপুর ট্রাম লাইনে বিদ্যুৎচালিত ট্রামের যাত্রা শুরু হয়। একে একে সব ট্রামই বিদ্যুৎচালিত হলো। লোহার পথে চাকার গান, জানলায় রোদের হাসি অথবা বৃষ্টির ঝাপটা মেখে সাহেব-মেমদের খুনসুঁটি, কেতাদুরস্ত বাবুর যাতায়াত, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বাঙালি পুরুষের আপিস যাওয়া, আধ মাথা ঘোমটা টেনে দ্রুতপদে স্বামীর পিছু পিছু হেঁটে আসা মহিলা— কলকাতার সার্কাডিয়ান রিদমের সঙ্গে সেই কবে যেন একাত্ম হয়ে গেল ট্রাম। কলকাতার ট্রাম। একটা সময়ে সারা কলকাতা জুড়ে ৭০ কিলোমিটারের উপরে ছিল যে ট্রামপথের দৈর্ঘ্য, কোভিডের পর থেকে দফায় দফায় তা কমেছে।
তবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে ট্রামকে পুনরুজ্জীবিত করতে উদ্যোগী হয়েছে। শুধু নিত্যযাত্রী পরিষেবা নয়, কলকাতার ট্রামকে ধর্মীয় পর্যটনেও ব্যবহার করার চিন্তাভাবনা রয়েছে তাদের। ক্যালকাটা ট্রাম ইউজ়ার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর জয়েন্ট সেক্রেটারি সাগ্নিক গুপ্ত এই সময় অনলাইনকে বললেন, ‘বাম আমল থেকেই ট্রাম উঠিয়ে দেবো, তুলে দেবো মনোভাব দেখেছি। তৃণমূল সরকার তো তুলে দেওয়ার ব্লু প্রিন্টও তৈরি করা শুরু করে দিয়েছিল। তবে আমরাও ২০১৬ সাল থেকে কাজ করে চলেছি। আগের সরকারের মনোভাব নিয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলাও করি। সে সময়েই আদালত দুমদাম করে রুট পরিবর্তন, রুট বন্ধের মতো বিষয়গুলি বন্ধ করে দেয়। গত সরকারের কাছে ট্রামের পলিসিও চায় হাইকোর্ট। সব গণ পরিবহণের পলিসি থাকলে, ট্রামের কেন থাকবে না? এখন নতুন সরকার এসেছে। ওরা যে উদ্যোগ নিচ্ছে, তা খুবই পজ়িটিভ।’
শহরের ক্লান্ত বুকে টুং টুং শব্দ, ভিড়ে ঠাসা ধর্মতলা হোক বা গড়িয়াহাট কিংবা শ্যামবাজারের চলতি ভিড়ে হঠাৎ ঘণ্টির আওয়াজে সতর্ক হওয়া, গমগম করে চোখের সামনে দিয়ে চলে যাওয়া যান, লোহার ট্র্যাকে চাকার ঘষা লাগা, ব্রেকের আওয়াজ— দূষণের চাদরে ঢাকা থতমত এই শহরে এ সবই তো রডোডেনড্রন। হারিয়ে যেতে দেওয়া যায়?