আজকাল ওয়েবডেস্ক: হাতেগোনা আর মাত্র কয়েকটা দিন তারপরই বাঙালি শ্রেষ্ঠ পুজো দুর্গোৎসব। বছর শেষে উমা আবার তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাপের বাড়ি আসবেন। বাঙালির দুর্গোৎসবের ঢাকে কাঠি আজ বৃহস্পতিবার রথের দিন অনেক জায়গায় পড়ে গেল। কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে দেবীর প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হয় বহু জায়গায়।
প্রাচীন ঐতিহ্য ও রীতি মেনে বৃহস্পতিবার সোজা রথের দিন প্রতিমার কাঠামো পুজো এবং তার গায়ে মাটি প্রলেপের মধ্যে দিয়ে দুর্গোৎসবের সূচনা হলো মুর্শিদাবাদের কান্দির জেমো বাগডাঙ্গা ভাঙাবাড়ির বুড়িমা দুর্গাপুজো। প্রায় ৫০০ বছর ধরে এখানে সিংহ পরিবারের সদস্যরা প্রাচীন রীতি মেনে আজও দুর্গাপুজো করে আসছেন। পুরনো ঐতিহ্য মেনে আজও সোজা রথের দিন দুর্গার কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে সিংহ পরিবারে ‘বুড়িমা’ দুর্গাপুজোর সূচনা হয়।
এই পূজোর সূচনা কবে হয়েছিল তা কেউই সঠিকভাবে বলতে পারেন না। তবে পরিবারের সদস্যদের দাবি প্রায় ৫০০ বছর আগে বিক্রম সিংহ নামে পরিবারের এক সদস্য এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। দুর্গাপুজার প্রাচীনত্বের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা দেবীকে আদর করে 'বুড়িমা' বলে ডাকেন।
তবে কান্দিতে বাগডাঙ্গা জমিদার বাড়ির এই পুজো ভাঙাবাড়ির বুড়িমা দুর্গাপুজো নামেই বেশি খ্যাত। পরিবারের সদস্য সত্যব্রত সিংহ বলেন, “এই পুজোর নাম ভাঙাবাড়ির দুর্গাপুজো হওয়ার নেপথ্যে এক অদ্ভুত গল্প রয়েছে। কয়েক’শো বছর আগে এই পরিবারের প্রত্যেক ‘তরফ’ নিজেরা জমিদার ছিল। সেই কারণে বাড়িতে বড় দুর্গা প্রতিমার দালান ছিল, সেখানেই পুজো হতো।” তিনি বলেন, “কোনও এক সময় পুজোর এক সেবাইত স্বপ্নাদেশ পান মা আর পাকা বাড়িতে থাকতে চান না। মা তাঁকে আদেশ দিয়েছিলেন মাটির বাড়ি করে রেখে দেওয়ার জন্য। সেই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর পাকা বাড়ি ভেঙে মায়ের জন্য মাটির বাড়ি করে সেখানে এই পুজো শুরু হয়েছিল। তাই এই পুজোর নাম ‘ভাঙাবাড়ির পুজো’।”
তবে বর্তমানে সিংহ পরিবারে রাজা বা রাজপ্রাসাদ না থাকলেও বাগডাঙ্গা জমিদার বাড়ির সংস্কার করা হয়েছে। পরিবারের বর্তমান সদস্যরা প্রাচীন নিয়ম নীতি মেনে আজও যেমন দুর্গাপুজো করেন ,তেমনই বাড়িতে বিভিন্ন দেবদেবীর নিত্য পুজো হয়। সিংহ পরিবারে প্রায় ৫০০ বছর আগে যখন প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনা হয় তখন দেবীর গায়ের রং ছিল গৌর বর্ণের। সেই প্রাচীন প্রতিমার মতো দেবীর গায়ের এবং শাড়ির রং এখনও একই রয়ে গিয়েছে এখানে। দেবীর রঙের কোনও পরিবর্তন করা হয় না।
সত্যব্রত সিংহ বলেন, “আমাদের পরিবারে পুজো শুরু হওয়ার পর থেকে কাঠামো বা পাটাতনের কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। একই কাঠামোর ওপর প্রতি বছর প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। সোজা রথের দিন পুরোহিত এসে গঙ্গার মাটি দেন কাঠামোয়। এরপর প্রতিমা শিল্পী ঠাকুর নির্মাণের কাজ শুরু করেন। রথের দিন পুরোহিত কাঠামোতে মাটি না দিলে প্রতিমা নির্মাণ করা হয় না।” সিংহ পরিবারের ‘বুড়িমা’ দুর্গাপুজোতে বেশ কিছু অনন্য রীতি নীতি পালন করা হয়। পুজোর দিন বহু মানুষ দূর দূরান্ত থেকে 'বুড়িমা'কে দেখতে আসেন। এখানে সিংহের বদলে দেবীর বাহন নরসিংহ।
পুজোর পুরোহিত ত্রিদিব গোস্বামী বলেন, “আজ কাঠামো পুজোর পর তার উপর গঙ্গা মৃত্তিকা লেপন করার মধ্য দিয়ে সিংহ পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা হল। এরপর প্রতিমা শিল্পীর হাতে ধীরে ধীরে মা দুর্গা এবং তাঁর ছেলেমেয়েদের মূর্তি তৈরির কাজ শুরু হয়ে যাবে।”