জীব বৈচিত্রের অনেক কিছুই আজও আমাদের অজানা। ভূতাত্ত্বিকদের একের পর এক অভিযান আমাদের ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করায়। চিনতে শেখায়, জানতে শেখায় হাজার বছর ধরে মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকা বিবর্তনের দিনলিপি। ভূতাত্ত্বিক সেই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও গবেষণার স্বার্থে সেই জায়গাগুলিতে তৈরি হয় জিওপার্ক। বিশ্বের ৫১টি দেশে এরকম ২৪১টি গ্লোবাল জিওপার্ক রয়েছে। চিন, ফ্রান্স, জাপান, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলির তালিকায় কি এ বার যুক্ত হতে চলেছে ভারতের নামও? তৈরি হয়েছে সেই সম্ভাবনা।
নেপাল সীমান্ত এলাকায় উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ের কোলে এক মায়াবী জায়গা পিথোরাগড়। প্রাচীন স্ট্রোমাটোলাইট জীবাশ্ম, হিমালয়ের মনোরম ভূ-প্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ সংমিশ্রণ— এই জায়গার মহিমা কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। সম্প্রতি কেএমএসবি হিমালয়ান ইন্টার কলেজে আয়োজিত এক সেমিনারে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাম লাল আনন্দ কলেজের একটি গবেষক দল, হিমালয়ের কোলে থাকা এই জায়গাটি জেলার ভূ-ঐতিহ্য বা 'জিও-হেরিটেজ'-এর বিষয়গুলো তুলে ধরেন। অনন্য ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অঞ্চলকে ভারতের প্রথম ইউনেস্কো গ্লোবাল জিওপার্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রাখছেন গবেষকরা।
ইউনেস্কো গ্লোবাল জিওপার্ক হলো এমন একটি অঞ্চল, যেখানে আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গবেষণা এবং পর্যটনের উন্নয়ন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই একাধিক জিওপার্ক রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত ভারতের কোনও অঞ্চল এই মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি। সেই সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে দিল্লির এই গবেষক দলের পর্যবেক্ষণে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, পিথোরাগড় এবং এর সংলগ্ন বেরিনাগ, গাঙ্গোলিহাট ও চৌকোরি এলাকায় উল্লেখযোগ্য ভূতাত্ত্বিক গঠন, হিমবাহ, নদী, গুহা, জীবাশ্ম ও খনিজ সম্পদের উপস্থিতি রয়েছে। এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি জীববৈচিত্র, ঐতিহ্যগত সংস্কৃতিই এই জায়গাটিকে উপযুক্ত করে তুলেছে।
জিও সায়েন্টিস্ট ডঃ প্রভাস পান্ডে একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, স্ট্রোমাটোলাইট হলো প্রাচীন অণুজীব সম্প্রদায়ের দ্বারা সৃষ্ট স্তরযুক্ত জীবাশ্ম-কাঠামো, যা পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের অন্যতম প্রাচীন প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই স্ট্রোমাটোলাইট আস্তরণ রয়েছে এই এলাকাজুড়ে। পান্ডে ওই সংবাদমাধ্যমকে ব্লেনড ‘বিশ্বজুড়ে খুব সীমিত সংখ্যক স্ট্রোমাটোলাইট স্থান সম্পর্কে জানা যায়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে এটি স্ট্রোমাটোলাইট ঐতিহ্য প্রদর্শনকারী ভারতের প্রথম বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত জিওপার্ক হতে পারে।’
যদি পিথোরাগড় এই স্বীকৃতি পায়, তা হলে উত্তরাখণ্ডে ভূ-পর্যটন বা জিও-ট্যুরিজমের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে তো বটেই। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরের গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এই অঞ্চলে গবেষণার সুযোগ পাবেন। স্থানীয় অর্থনীতিও পর্যটন বৃদ্ধির মাধ্যমে লাভবান হতে পারে। সামগ্রিক ভাবে, ভারতীয় পর্যটন ও ভূতাত্ত্বিক গবেষণার জন্যেও এই সিদ্ধান্ত বড় ভূমিকা পালন করবে।