• Explainer: বেতন, পদোন্নতি না স্টার্টআপের টান? কেন ISRO ছাড়ছেন একের পর এক বিজ্ঞানী?
    এই সময় | ১৭ জুলাই ২০২৬
  • সকলের মন তখন বিষণ্ণ। হাইড্রলিক ক্রেন ভেঙেছে, রিমোট লঞ্চ সিস্টেম কাজ করছে না। তা হলে কি সব আয়োজন বৃথা? হোমিকে বোঝানো হচ্ছে, ‘Counterweight Maneuvering’ (রকেট উৎক্ষেপণের প্রয়োজনীয় শক্তি) ছাড়া রকেট লঞ্চ করা সম্ভব না। কিছু একটা ভাবতে ভাবতে পিছন থেকে একজন দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা পারব।’ কিন্তু কী ভাবে? তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমরা ম্যানুয়ালি লঞ্চ করব?’ বিক্রমের সেই সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছিলেন হোমিও। ইতিহাস তৈরি করেছিল ভারত। দেশের প্রথম রকেট লঞ্চ হয়েছিল ম্যানুয়ালি। কেরালার থুম্বা লঞ্চ স্টেশনে সেই দৃশ্যের যাঁরা সাক্ষী ছিলেন, তাঁরা সে দিনই ভেবেছিলেন, এই দেশ মহাকাশ গবেষণায় অন্যন্য নজির তৈরি করতে প্রস্তুত। তিরুবন্তপুরমের সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে অভিন্ন হৃদয়ের দুই বন্ধুও আকাশ ছোঁয়ার শপথ নিয়েছিলেন। বিক্রম সারাভাই ও হোমি জাহাঙ্গির ভাবা— যাঁদের হাত ধরে দেশের প্রথম মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ISRO) পথচলা শুরু।

    ভারতের অন্যতম গর্বের সেই প্রতিষ্ঠান (ISRO) সম্পর্কিত একটি খবর নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশকে। যে প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার জন্যে ছেলেমেয়েরা স্বপ্ন দেখেন, কাজ করার জন্য লক্ষ্যস্থির করে, সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই একশোর বেশি বিজ্ঞানী বেরিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ কেন এই অবস্থা? ভারত যখন ‘গগনযান’ কর্মসূচির দোরগোড়ায়, তখন একের পর এক বিজ্ঞানীর প্রস্থান চিন্তা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারেও। যদিও ইসরোর চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন জানিয়েছেন, কর্মী চলে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয় এবং ISRO-র চলমান মিশনগুলোর উপরে এর কোনও প্রভাব পড়বে না।

    একাধিক বিজ্ঞানীর ISRO ছাড়ার পিছনে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একাধিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বেতন কাঠামো, পেশাগত অগ্রগতি এবং কর্মক্ষেত্রের নমনীয়তা– মূলত এই তিনটি কারণে উপরে জোর দিচ্ছেন অনেকেই। মহাকাশ গবেষণা নিয়ে কাজ করা স্টার্ট আপ কোম্পানিগুলিতে ‘High Ambition’ নিয়ে চলে যাচ্ছেন অনেকেই।

    যদিও এটিকে ‘ব্রেন ড্রেন’ বলে মানতে নারাজ অনেকেই। তাঁদের মতে, কয়েক দশক ধরে ভারতের মহাকাশ বিষয়ক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ইসরো এক অনন্য অবস্থান ধরে রেখেছে। বিজ্ঞানীরা সাধারণত তাঁদের কর্মজীবনের একটি বড় অংশ এই সংস্থাতেই অতিবাহিত করেন। কারণ বেসরকারি জায়গার তুলনায় সরকারি বেতন কাঠামো অনেক সময় পিছিয়ে থাকলেও, জাতীয় মিশনে কাজ করার সুযোগ রয়েছে অনেকে। এমনকী লঞ্চ ভেহিকেল (রকেট), স্যাটেলাইট সিস্টেম বা প্রপালশন প্রযুক্তিতে বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য দেশে খুব কম বিকল্প সুযোগ রয়েছে।

    ২০২০ সালে মহাকাশ নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশগ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত করে সরকার। একটি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী,বর্তমানে লঞ্চ সার্ভিস, উপগ্রহ নির্মাণ, প্রপালশন সিস্টেম, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, মহাকাশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ডাউনস্ট্রিম অ্যাপ্লিকেশনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৪০০টি স্টার্টআপ কার্যক্রম পরিচালনা করছে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল স্পেস প্রমোশন অ্যান্ড অথোরাইজেশন সেন্টার’।

    তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভারতের বেশ কয়েকটি প্রথমসারির মহাকাশ-বিষয়ক স্টার্টআপ— যেমন স্কাইরুট অ্যারোস্পেস, অগ্নিকুল কসমস, পিক্সেল, বেলাট্রিক্স অ্যারোস্পেস এবং দিগন্তরা— প্রতিষ্ঠা করেছেন বা এগুলোতে কাজ করছেন ইসরোর (ISRO) প্রাক্তন বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা।

    ২০২২ সালে রকেট উৎক্ষেপণকারী প্রথম ভারতীয় বেসরকারি কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে স্কাইরুট। বর্তমানে তারা ‘বিক্রম-১’ (Vikram-1) উৎক্ষেপণ যান অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অগ্নিকুল নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এক-খণ্ডবিশিষ্ট (single-piece) থ্রিডি-প্রিন্টেড রকেট ইঞ্জিন ও ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণকারী যান তৈরি করেছে। অন্যদিকে পিক্সেল নামক কোম্পানিটি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পৃথিবী পর্যবেক্ষণের জন্য হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং উপগ্রহ মোতায়েন করেছে। এ ধরনের কোম্পানিগুলির উত্থান নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। উচ্চ বেতনের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শেয়ারের মালিকানা, দ্রুত পেশাগত পদোন্নতি এবং ছোট ও উদ্ভাবন-কেন্দ্রিক দলে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে।

    আমেরিকার মতো দেশে বিজ্ঞানী বা ইঞ্জিনিয়াররা নিয়মিতভাবে নাসা (NASA) ছাড়াও স্পেসএক্স (SpaceX), ব্লু অরিজিন (Blue Origin), রকেট ল্যাব (Rocket Lab)-এর মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করে থাকেন। তবে ভারতের বাণিজ্যিক মহাকাশ গবেষণার পরিসর এখনও বেশ ছোট। সেটিও মূলত ইসরো (ISRO)-র উৎক্ষেপণ অবকাঠামো ও কারিগরি দক্ষতার উপরে নির্ভরশীল। ইসরোর কার্যক্রম মূলত প্রপালশন, এভিওনিক্স, মিশনের নিরাপত্তা এবং সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের উপরে ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল। এই দক্ষতা গড়ে তুলতে বছরের পর বছর সময় লাগে। ফলত, ইসরোর পরিপূরক হিসেবে কোনও প্রতিষ্ঠানের গড়ে ওঠার বিষয়টি অদূর ভবিষ্যতে নেই।

    অনেকের মতে, জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থাকে প্রতিস্থাপনের পরিবর্তে এই বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ একে পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে, যদিও একই দক্ষ জনশক্তির জন্য তারা প্রতিযোগিতাও করছে।

    ২০২০ সালে ইসরোর বিভিন্ন কেন্দ্রের প্রধানদের যে ক্ষমতা দিয়েছিল, সেটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানী ও কারিগরি কর্মীদের পদত্যাগ এবং স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন গ্রহণ করতে পারতেন, তাঁদের সেই ক্ষমতা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এ ধরনের আবেদনের জন্য বিভাগের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে; বিশেষ করে ‘গগনযান’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

  • Link to this news (এই সময়)