এই সময়: শিশুদের টাইপ–১ ডায়াবিটিস বা জুভেনাইল ডায়াবিটিস চিকিৎসায় পশ্চিমবঙ্গে গড়ে ওঠা একটি সরকারি স্বাস্থ্য মডেলকে কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি জাতীয় কর্মসূচিতে রূপান্তরিত করেছে। এ বার সেই সাফল্যগাথাই উঠে এলো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য মহলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে।
বঙ্গ মডেলের এই ভারতীয় হয়ে ওঠার কাহিনিই বিশ্বের বৃহত্তম পেডিয়াট্রিক টাইপ–১ ডায়াবিটিস সহায়তা কর্মসূচি ‘লাইফ ফর আ চাইল্ড’ (এলএফএসি)-এর সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে উঠে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, ভারতেই এখন বিশ্বের বৃহত্তম জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পেডিয়াট্রিক টাইপ–১ ডায়াবিটিস কর্মসূচি চলছে। সেই পোস্টে বিশেষ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট সুজয় ঘোষ ও তাঁর সহযোগীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গ মডেলের কথা, যা অনুসরণ করেই কেন্দ্রীয় সরকার গোটা দেশে এই কর্মসূচি ছড়িয়ে দিয়েছে গত এপ্রিলে।
এই পশ্চিমবঙ্গ মডেল মূলত টাইপ–১ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত শিশু ও কিশোর–কিশোরীদের জন্য একটি সুসংহত সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা। শুধু ইনসুলিন সরবরাহ নয়, যথাসময়ে রোগী চিহ্নিতকরণ, জেলাস্তরে স্পেশ্যালাইজ়ড ক্লিনিক, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স, নিয়মিত HbA1c পরীক্ষা, গ্লুকোমিটার ও টেস্ট স্ট্রিপ বণ্টন, পুষ্টিবিদ ও মনোবিদের পরামর্শ, ডিজিটাল রোগী নথিভুক্তিকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপ— সব পরিষেবাকে একছাতার তলায় আনা হয়েছে এই মডেলে। ২০২১–এ পশ্চিমবঙ্গে পরীক্ষামূলক ভাবে চালু হওয়া এই প্রকল্পের সাফল্যের পরে সেই অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক জাতীয় নীতির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে সম্প্রতি। দেশজুড়ে সেই নীতি প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের সূচনা উপলক্ষে গত ১০ জুলাই কলকাতায় এ নিয়ে একটি সর্বভারতীয় কর্মশালাও আয়োজিত হয়েছে।
বাংলার মডেলকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার যে নতুন জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি করেছে, সেইমতো ধাপে ধাপে দেশের প্রায় ৮০০ জেলায় শিশুদের টাইপ–১ ডায়াবিটিসের জন্য স্পেশ্যালাইজ়ড ক্লিনিক গড়ে তোলা হবে। সেখানে থাকবেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত নার্স, পুষ্টিবিদ, কাউন্সেলর এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়া হবে বেসাল-বোলাস ইনসুলিন, সিরিঞ্জ, গ্লুকোমিটার, ল্যান্সেট (ছোট ডিসপোজ়েবল ছুঁচ), প্রতি মাসে ১০০টি টেস্ট স্ট্রিপ, HbA1c-সহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুবিধা এবং নিয়মিত ফলো-আপ। উদ্দেশ্য, দেশের কোনও শিশুই যেন পরিকাঠামো, সুযোগ ও অর্থের অভাবে টাইপ–১ ডায়াবিটিসের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়।
সুজয় ও তাঁর সহযোগী মাসুমা ইয়াসমিন এবং এসএসকেএমে তাঁদের সহকারীদের এই সাফল্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অবশ্য হঠাৎ আসেনি। গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক ভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই উদ্যোগ। ২০২৫–এ শিশুদের ডায়াবিটিস পরিচর্যায় অভিনব জনস্বাস্থ্য মডেল গড়ে তোলার জন্য ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর পেডিয়াট্রিক অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট ডায়াবিটিস (ইসপাড)-এর ‘ইনোভেশন ইন পেডিয়াট্রিক ডায়াবিটিস কেয়ার’ পুরস্কারও পান সুজয়।
পরে ইসপাড-এর সরকারি নিউজ়লেটারেও পশ্চিমবঙ্গের মডেলকে ভারতের জাতীয় কর্মসূচির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তাকে ‘অ্যান ইনস্পায়ারিং স্টোরি’ আখ্যা দেওয়া হয়। এর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশও এই মডেল গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। সুজয় নিজে অবশ্য মনে করেন, এই সাফল্য আসলে তাঁর দলের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের জনস্বাস্থ্য মডেল যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে, তারই গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।