• এমপি পদ ছাড়লেন কোয়েলও, দ্বন্দ্ব দুই তৃণমূ‍লে
    এই সময় | ১৭ জুলাই ২০২৬
  • এই সময়, কলকাতা ও নয়াদিল্লি: আগেই গিয়েছিলেন তিন জন, বৃহস্পতিবার আরও এক জন। রইলেন বাকি ন’জন!

    সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব, প্রকাশ চিক বরাইকের পরে এ দিন রাজ্যসভায় তৃণমূলের চতুর্থ সাংসদ হিসেবে ইস্তফা দিলেন কোয়েল (রুক্মিণী) মল্লিক। বুধবার রাজ্যসভার চেয়ারপার্সন সিপি রাধাকৃষ্ণনের সঙ্গে দেখা করে তিনি ইস্তফা দেওয়ার পরে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গে নিযুক্ত বিজেপির পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে। প্রথম তিন জন রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে দল বদলে বিজেপিতে গিয়েছেন এবং গেরুয়া শিবিরের হয়েই ফের রাজ্যসভার টিকিট পেয়েছেন। কোয়েলও সেই পথে হাঁটবেন কি না, সে দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। বিধানসভা ভোটের কিছু আগেই গত মার্চে কোয়েল–সহ চার জনকে রাজ্যসভায় সাংসদ পদে প্রার্থী করেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৬ এপ্রিল সাংসদ হিসেবে শপথ নেন কোয়েল। সূত্রের দাবি, বেশ কিছুদিন আগেই রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করে ই–মেল করেছিলেন কোয়েল। তখন তাঁকে বলা হয় সশরীর ইস্তফাপত্র জমা দিতে হবে। সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পরে সেই অর্থে একদিনও রাজ্যসভার অধিবেশনে অংশ না–নিয়েই পদত্যাগ করলেন কোয়েল।

    বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার সময় পর্যন্ত লোকসভা ও রাজ্যসভায় তৃণমূলের যথাক্রমে ২৮ ও ১৩ জন এমপি ছিলেন। রাজ্যে পালাবদলের পরে লোকসভার ২০ জন তৃণমূল সাংসদ বিদ্রোহী হয়ে যোগ দিয়েছেন এনসিপিআইয়ে। ফলে এই মুহূর্তে খাতায়কলমে কালীঘাট–তৃণমূলের ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছেন লোকসভার মাত্র আট সাংসদ। আর রাজ্যসভায় চার জনের ইস্তফার পরে কালীঘাট শিবিরের দিকে রইলেন আপাতত ন’জন। তবে এই ভাঙন আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে বলেই গুঞ্জন। এর আগে সুখেন্দু, সুস্মিতা, প্রকাশরা দল ছাড়ার কারণ হিসেবে তৃণমূলে দুর্নীতি, সংগঠনকে গুরুত্ব না–দিয়ে শুধুমাত্র একটি ভোটকুশলী সংস্থার উপরে নির্ভরশীলতার মতো বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছিলেন। তবে কোয়েল এ দিন ইস্তফা প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করেননি।

    কোয়েল যে জোড়াফুলের রাজ্যসভার পদ ছাড়তে চলেছেন, তা তিনি আগাম জানতেন বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে কালীঘাটের পাশ থেকে যাঁরা বিদ্রোহী শিবির অথবা সরাসরি গেরুয়া শিবিরে যেতে চান, তাঁদের ২১ জুলাইয়ের আগেই চলে যেতে বলেছেন তৃণমূলনেত্রী। কালীঘাটের বাসভবনে এ দিন ফেসবুক লাইভ করে মমতা বলেন, ‘দেখলাম একজন সাংসদ, ভালো চলচ্চিত্র শিল্পী, তাঁকে সম্মান করি, তিনি বিজেপির একজন নেতার সঙ্গে মিটিং করে পদত্যাগ করেছেন। আমি আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, উনি আগেই (কালীঘাটে) ই–মেল পাঠিয়েছেন। ধন্যবাদ ওঁকে, আজ (বৃহস্পতিবার) উনি সশরীর (ইস্তফাপত্র) জমা দিতে গিয়েছেন।’

    গত দেড় দশকে মমতা টলিউডের একাধিক মুখকে রাজ্যসভা কিংবা লোকসভায় টিকিট দিয়েছেন। সেই ট্রাডিশন মেনেই কোয়েলকে টিকিট দিয়েছিলেন তিনি। রাজ্যসভায় কোয়েলকে প্রার্থী করার কয়েক সপ্তাহ আগে দক্ষিণ কলকাতায় তাঁদের বাসভবনে গিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় কথা বলেন রঞ্জিত মল্লিক ও কোয়েলের সঙ্গে। কোয়েলকে এ দিন মমতা আক্রমণ না করলেও তিনি বলেছেন, ‘যাঁদের যাঁদের যাওয়ার আছে আরও, বিজেপির চাপে, পুলিশের চাপে, ইডি–সিবিআইয়ের চাপে, ভয়ঙ্কর সিআইডি কেসের চাপে, আইসি–ওসি–এসটিএফের চাপে— তাঁদের অনুরোধ করব, ২১ জুলাইয়ের আগে যাঁর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ে নিন। লোটাকম্বল নিয়ে যেখানে ইচ্ছে যান।’

    কোয়েলের পদত্যাগ নিয়ে কালীঘাটকে কটাক্ষ করেছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘মধু কবি লিখেছিলেন, একে একে নিভিছে দেউটি। তিন জন সাংসদ আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। কোয়েল মল্লিকও পদত্যাগ করলেন। আরও কে কে পদত্যাগ করবেন? আকাশে বাতাসে অনেক নাম শোনা যাচ্ছে! আরও দেউটি হয়তো নিভবে।’

    এক সময়ে জোড়াফুলের দক্ষিণ কলকাতা সাংগঠনিক জেলার চেয়ারম্যানের পদ সামলানো মণীশ গুপ্তও বৃহস্পতিবার তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি এ দিন বলেন, ‘আমি তৃণমূলে নেই, কোনও রাজনৈতিক দলে নেই, আমি রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছি। দক্ষিণ কলকাতায় বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি তো বাদ। গত পাঁচ বছর আমি কোনও ভালো পদে ছিলাম না।’

    যদিও তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের বক্তব্য, ২১ জুলাইয়ের ঘটনায় অন্যতম বিতর্কিত চরিত্র (রাজ্যের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব), কোনও জনভিত্তি না থাকা প্রাক্তন আমলা মণীশকে মমতার জমানায় বিদ্যুৎমন্ত্রী করা হয়েছিল। রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছিল। যে তৃণমূল ২১ জুলাই ‘শহিদ দিবস’ পালন করে, তারা কী ভাবে মণীশ গুপ্তকে মন্ত্রী করল, সে প্রশ্ন তুলেছি‍ল বাম–কংগ্রেসও। প্রদেশ কংগ্রেস শহিদ মিনারে এ বার যে ২১ জুলাই পালন করতে চলেছে, তার অন্যতম ইস্যু হচ্ছে মণীশ গুপ্তর ফাইল খোলার দাবি। কলকাতায় কংগ্রেসের ২১ জুলাইয়ের যে হোর্ডিং দেওয়া হয়েছে, সেখানে লেখা, ‘১৯৯৩ সালে যুব কংগ্রেসের মিছিলে গুলি চালানোর পান্ডা মণীশ গুপ্তর ফাইল খোলার দাবিতে শহিদ মিনার চলুন’। ২১ জুলাইয়ের ঘটনার অনুসন্ধানের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশন গঠন করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। যদিও তাদের রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করা হয়নি। মণীশকে নিয়ে মমতা নির্দিষ্ট ভাবে কোনও মন্তব্য না–করলেও ফেসবুক লাইভে তিনি বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি না। যাঁরা যাওয়ার দয়া করে ২১ জুলাইয়ের আগে ওদের (বিদ্রোহী তৃণমূল বা বিজেপি) সঙ্গে নাম লেখান। নিজেদের পরিবার, সম্পদ, লাগেজ–ব্যাগেজের জন্য তো বিজেপির প্যাকেজ রয়েছে।’

  • Link to this news (এই সময়)