বিশ্বদেব ভট্টাচার্য, আসানসোল
সাপের আড্ডা হয়ে উঠেছে সংরক্ষিত চিত্তরঞ্জন রেল শহর। এক দিকে শহরে জঙ্গলের পরিমাণ বাড়ছে, আছে বিশাল বিশাল জলাধার, তার সঙ্গে পরিত্যক্ত আবাসনের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে সাপেদের বসবাসের একেবারে আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়েছে এখানে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রতিদিনই প্রায় দু’তিনটি করে সাপ ধরা পড়ছে, যার মধ্যে বিষধর সাপের সংখ্যাই বেশি।
আঁতকে ওঠার মতো এই পরিস্থিতিতে চিত্তরঞ্জন ও রূপনারায়ণপুর এলাকার মানুষের ভরসা হয়ে উঠেছেন পাঁচ জন মানুষ— রেলকর্মী পিন্টু দাস, অঙ্কন দাস, সিয়ারাম নিষাদ, মনজিত কুমার এবং অটোচালক অশোক রাম। ২০১৭-এ নিজেদের মধ্যে একটি ‘স্নেক ক্যাচার গ্রুপ’ তৈরি করেন তাঁরা। চিত্তরঞ্জন বা রূপনারায়ণপুর থেকে সাপ উদ্ধার করে দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরের গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দেন এবং প্রতি ক্ষেত্রেই বন দপ্তরকে তা জানানো হয়।
অশোক বলেন, ‘চিত্তরঞ্জন, রূপনারায়ণপুর থেকে গত এক বছরেই প্রায় এক হাজারের মতো সাপ আমরা ধরেছি। বুধ এবং বৃহস্পতিবারে আমি একাই তিনটে সাপ ধরলাম। কোন সাপ কত পরিমাণ ধরা হয় তার যাবতীয় তথ্য দুর্গাপুর বন দপ্তরকে জানিয়ে দিই আমরা।’
উদ্ধারকারীদের মূল উদ্যোক্তা পিন্টু দাস ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে এবং অশোক নবম শ্রেণি থেকে সাপ ধরছেন। চেন্নাই থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেওয়া এই দলের পিন্টু জানান, জীবনে যখন শুরু করেছিলেন, তখন তা ছিল নেশা। এখন মানুষকে বাঁচানোর কথা ভেবে নিজেরা বিপদ হাতে নিয়ে এই কাজ করছেন। তাঁর আক্ষেপ, গত তিন-চার বছরের তুলনায় সাপের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ইদানীং শাঁখামুঠি, গোখরো, খরিস, চিতি, ঢ্যামনা, কেউটে, বেতআছড়া এবং মারাত্মক বিষধর কালাচ সাপও পর পর ধরা পড়ছে। সাপের উপদ্রব কমাতে চিত্তরঞ্জনেই একটি অস্থায়ী সাপের পুনর্বাসন কেন্দ্র তৈরির দাবি তুলেছেন পিন্টু।
একইসঙ্গে রাজ্য সরকারের কাছে তাঁর আবেদন, ‘পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় প্রচুর সাপ পাওয়া যায়, যেখান থেকে সরকারের উদ্যোগে এই রাজ্যেই অ্যান্টি-স্নেক ভেনম (এভিএস) তৈরি করে সাপের কামড়ে মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো সম্ভব। বাইরের রাজ্য থেকে যে অ্যান্টি-স্নেক ভেনম আনা হয়, সেই রাজ্যের আবহাওয়ার থেকে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।’
অতীতে উদ্ধারকাজে গিয়ে পিন্টু ও অশোক দু’জনেই বিষধর সাপের কামড় খেয়ে হাসপাতালের চিকিৎসায় কোনওমতে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। অশোক জানান, বর্তমানে অটো চালানোর মাঝখানেও খবর পেলে সাপ উদ্ধারে তিনি ছুটে যান। কালাচ সাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দু’বছর আগে এই শহরে কালাচ সাপ মাঝেমধ্যে দেখা যেত, কিন্তু ইদানিং অনেক বেশি দেখা পাওয়া যায়। কালাচ সাপ হলো সাইলেন্ট কিলার। কারণ এই সব সাপ সাধারণত রাতে কামড় বসায়, কিন্তু খুব সহজে তা বোঝা যায় না এবং পরের দিন সকালেই সেই ব্যক্তির অবচেতনেই মৃত্যু ঘটে।’
শুধু সাপ ধরাই নয়, গ্রামবাসীদের ও স্কুলপড়ুয়াদের সচেতন করার কাজও করে এই দলটি। সাপ না-মেরে তা বাঁচিয়ে রাখার অনুরোধ জানিয়ে অশোক বলেন, ‘মনে রাখতে হবে একটা সাপ প্রচুর পরিমাণ ইঁদুরকে খায়, আর ইঁদুরগুলো আমাদের বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য খেয়ে ফেলে ও নষ্ট করে।’ অন্য দিকে, রেল ইউনিয়নের একাধিক নেতৃত্বের অভিযোগ, শুধু পরিত্যক্ত আবাসনই নয়, রেল শহরের জঙ্গল ও নর্দমাগুলোও ঠিকঠাক পরিষ্কার করা হয় না। কর্তৃপক্ষকে বার বার জানিয়েও সুরাহা মেলেনি, যার ফলেই আজ গোটা শহর সাপেদের ডেরায় পরিণত হয়েছে।