• যন্ত্রণার শেষযাত্রা চাই না, স্বেচ্ছা-মৃত্যুর উইল শহরে!
    বর্তমান | ১৭ জুলাই ২০২৬
  • বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: চার ভাই, দুই বোন হাসপাতালে ঘিরে বাবাকে। লিভার ক্যানসারের অন্তিম পর্যায়ের রোগী। ডাক্তারবাবু ৫ মিনিট সময় দিয়েছেন দেখার। তাতেই আইসিইউয়ের সংকটাপন্ন রোগীদের সামনেই বাক্‌বিতণ্ডা শুরু করেছেন। আর ক’দিন ভেন্টিলেশনে? তিন ভাই সহমত। আর নয়। চিকিৎসকরাই জানিয়েছেন, মৃত্যু সময় গোনা। ফেরার চান্স নেই। ভেন্টিলেটর ও অ্যাগ্রেসিভ চিকিৎসা চালু আর বন্ধ রাখা একই। বেঁকে বসেছেন এক ভাই, দুই বোন। তাঁদের সাফ কথা, যতক্ষণ মনিটরের গ্রাফ ওঠানামা করছে, বাবা জীবিত। ক’টা টাকার জন্য ভাইরা এত নীচে নামছে? ব্যস, তুমুল ঝগড়া। 

    এ চিত্র শুধু বাগবাজারের সমাদ্দার পরিবারের নয়—অন্তিম সময়ে যখন প্রিয়জন হাসপাতালে কথা বলার অবস্থায় নেই, কী করা উচিত তাঁর ভবিষ্যৎ চিকিৎসা নিয়ে, বহু বাঙালি পরিবারই তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। একাধিক পুত্র-কন্যা থাকলে অশান্তি আটকানো আরও কঠিন! 

    সংকট মেটাতে শহরে শুরু হয়েছে অভিনব ‘লিভিং উইল’। ‘স্বেচ্ছা-মৃত্যু’র সংকল্প। সুস্থ অবস্থায় সজ্ঞানে মানুষ জানাচ্ছে, কঠিন অসুখে ফেরার রাস্তা না থাকলে দিনের পর দিন ভেন্টিলেটর, একমোতে রাখা হবে? চলবে ডায়ালিসিস? জীবন্মৃত থাকলেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ রাইলস টিউবে খাওয়ানো চলবে? সেপটিসেমিয়ায় মাল্টি অর্গান ফেলিয়োর হলেও, দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক চলবে? ক্যানসারের অন্তিম পর্যায় পেরোলেও কেমোর ডোজ পাবেন? 

    সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে সম্বল করে বেশকিছু সংগঠন শুরু করেছে এই উদ্যোগ। তাদেরই অন্যতম ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ( রাজ্য শাখা) সদস্য শহরের বিশিষ্ট পেইন স্পেশালিস্ট ডাঃ গার্গী নন্দী বলেন, ‘চিকিৎসকদের বোর্ড রোগীর ফেরা অসম্ভব জানালে কী করণীয়, ‘লিভিং উইল’-এ সজ্ঞানে মানুষ আগাম দিকনির্দেশ করতে পারবেন। অঙ্গীকারপত্র পূরণ করে সাক্ষীর উপস্থিতিতে নোটারি করে রাখতে হবে। জানাতে হবে নিজের চিকিৎসক ও স্থানীয় প্রশাসনকে। ২০২৩-এ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ( রিট পিটিশন ২১৫ অব ২০০৫) পর মানুষের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার আছে।’ 

    নিউটাউনের বাসিন্দা প্রবীণ গাইনেকোলজিস্ট ডাঃ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় ‘লিভিং উইল’ করেছেন। সোমবার জানান, ‘নিজেই এ সংকটে পড়েছিলাম। শাশুড়ির অন্তিম পর্যায়ে দু’বাড়ির সমস্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তাঁর মেয়ে অর্থাৎ আমার স্ত্রী ও আমার সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত মানবেন বলে জানান। সিদ্ধান্তের দিন সারারাত ঘুমোইনি। বারবার ভেবেছি, ভুল হল না তো! ছেলেমেয়ে যাতে এ সংকটে না পড়ে, ‘লিভিং উইল’ করেছি।’ হুগলি নিবাসী এক শিক্ষক ‘লিভিং উইল’ করে জীবনমরণ অসুখ হলে তাঁর চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দুই ছাত্রকে দিয়েছেন। 

    শহরের নামী ক্যানসার স্পেশালিস্ট ডাঃ জয়দীপ ঘোষ বলেন, ‘৪০-৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্তিম পর্যায়ের ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে বাড়ির লোকজনের তুমুল মতবিরোধ দেখেছি। অবিলম্বে সরকারের এই উইল নিয়ে মানুষকে সচেতন করা উচিত। অঙ্গীকারে আইনগত ফাঁকফোকর থাকলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে তাও পূরণ করা উচিত।’
  • Link to this news (বর্তমান)