মনোজ কর্মকার, কৌশিক ভট্টাচার্য
গাছ ভর্তি থোকা থোকা কদম ফুল। যেন খুব যত্ন নিয়ে সাজিয়েছে কেউ। গোড়ায় বসে রয়েছে এক শ্যামলা তরুণ। মাথায় ময়ূরের পালক। হাতে বাঁশি। পশ্চিম আকাশে প্রেমিকার কপালের টিপের মতো গোল চাঁদ উঠেছে। দূরে একটা টেরাকোটার মন্দির। তার গা বেয়ে গড়িয়ে নামছে জ্যোৎস্না। বাঁশি বাজার পরে হঠাৎ থেমে গেলে যেমন হয়, সুরটা বুকের ভিতরে পাক খেতে থাকে, চারপাশের বাতাসটা যেন সেই রকম।
কদম গাছের সামনে এক তরুণী। চিবুকে হাত। ওষ্ঠে হাসি। মোমের মতো হাতের গোছে সোনার কাঁকন। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে শ্যামলা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে, ‘অধরং মধুরং বদনং মধুরং/ নয়নং মধুরং হসিতং মধুরম্...।’ তাদের ঘিরে নাচছে জোনাকির দল। গোটা পৃথিবীর ক্লান্তি ধুয়ে যাচ্ছে। লালমাটির পথ, টেরাকোটার মন্দির, প্রাচীন বাঁধের স্থির জল যেন এক অন্য জগতের।
ভক্ত এমন দৃশ্য বৃন্দাবনে দেখেন। আর দেখেন বাঁকুড়ার ছোট্ট জনপদ বিষ্ণুপুরে। লোকমুখে এই নগর তাই ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’। সময় বোধহয় এখানে যাওয়া-আসা করে। কেউ কেউ ঢুকে পড়েন সেই ফাঁকে। শ্যামলা তরুণের সাক্ষাতে কেঁপে ওঠে তনু-মন। সেই বাঁশি শুনে চোখে জল আসে। বুক ভেসে যায়। আহ, কান্নায় এত শান্তি! চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে যে নগর নিজের বুকে কৃষ্ণভক্তির উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে চলেছে, সেই ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’কে এ বার নতুন করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিষ্ণুপুরকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতির জন্য প্রস্তাব পাঠানোর তোড়জোড় চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
বিষ্ণুপুরের ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ নিছক লোকমুখে প্রচলিত কোনও উপাধি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, ধর্ম, স্থাপত্য, সংস্কৃতি এবং ভক্তিরসের এক দীর্ঘ উত্তরাধিকার। পুরাণের প্রেমময় শ্যাম, মহাভারতের কূটনীতিক কৃষ্ণ কিংবা হরিবংশের যোদ্ধা কেশবের পা পড়েনি এখানে কোনও দিন। তবে তাঁর লীলা ছড়িয়ে রয়েছে মন্দিরের গায়ে, গ্রামের নামে আর মানুষের বিশ্বাসে।
সেটা ষোড়শ শতক। বাঁকুড়া তখন মল্লভূম। সিংহাসনে আসীন রাজা বীর হাম্বির। তাঁকে রাজজ্যোতিষী জানিয়েছিলেন, রাজ্যের সীমানা দিয়ে এমন একটি বহর যাবে, যাতে ‘অমূল্য রত্ন’ রয়েছে। একদিন বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের রচিত অমূল্য সব বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ নিয়ে গোরুর গাড়িতে চেপে যাত্রা শুরু করলেন শ্রীনিবাস আচার্য। মনে আশা, তিনি কৃষ্ণনাম ছড়িয়ে দেবেন পল্লি বাংলার পথে-ঘাটে। মল্লভূমের সীমানায় লুট হয়ে গেল সব।
সিন্দুক নিয়ে সৈন্যরা পৌঁছল রাজদরবারে। কিন্তু এ কী! অমূল্য ধনরত্ন কোথায়? সিন্দুক খুলতেই দেখা গেল, সোনা-রুপো নয়, সেখানে শুয়ে রয়েছে ভক্তির অক্ষর, প্রেমের শাস্ত্র। রাজা হতাশ। কিন্তু বুঝতে পারলেন না, তাঁর রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেছে এমন এক ধন, যা জগতের সমস্ত রত্নের চেয়েও মূল্যবান।
এ দিকে পুঁথি হারিয়ে শ্রীনিবাস আচার্য ঘাঁটি গাড়লেন বিষ্ণুপুরেই। তবে হতাশ হলেন না। একদিন রাজসভায় বসে তিনি শ্রীমদ্ভাগবতের ব্যাখ্যা শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠে কৃষ্ণকথা যেন ফল্গুর মতো বইতে লাগল। প্রতিটি শ্লোক, প্রতিটি ব্যাখ্যা যেন সাড়ে তিনশো মাইল ডিঙিয়ে বল্লমের মতো গিঁথে গেল রাজা বীর হাম্বিরের হৃদয়ে। তিনি বুঝলেন, যে ঐশ্বর্য এতদিন খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন, তা ধনসম্পদে নেই — রয়েছে ভক্তিতে, আত্মসমর্পণে।
শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ পেল। রাজা জানতে পারলেন, তাঁর আদেশে লুট হওয়া সেই সিন্দুকেই ছিল শ্রীনিবাস আচার্যের নিয়ে আসা অমূল্য বৈষ্ণব গ্রন্থসম্ভার। অপরাধবোধে তাঁর হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। তিনি শ্রীনিবাস আচার্যের চরণে লুটিয়ে পড়লেন, ‘ক্ষমা করো প্রভু।’ নতজানু হয়ে ফিরিয়ে দিলেন সমস্ত পুঁথি। তার পরে দীক্ষিত হলেন বৈষ্ণব ধর্মে। রাজমুকুটের অহঙ্কার গলে গিয়ে হৃদয়ে জায়গা করে নিল অকৃত্রিম কৃষ্ণপ্রেম। যুদ্ধজয়ের গৌরব ভিজে গেল সকরুণ ভক্তিরসে।
তার পর থেকেই নতুন বাঁকের মুখে এসে দাঁড়াল মল্লভূমের ইতিহাস। বিষ্ণুপুরে গড়ে উঠল একের পর এক মন্দির। কীর্তনের ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠল জনপদ, রাস-উৎসব আর বৈষ্ণব সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ল রাজ্যের সর্বত্র। শুধু মন্দির নির্মাণ নয়, হাম্বির গড়ে তুললেন এক আধ্যাত্মিক ভূগোল। বাংলার বুকেই সৃষ্টি করতে চাইলেন নতুন বৃন্দাবন, যেখানে ভক্ত মত্ত হয়ে থাকবেন কৃষ্ণপ্রেমে।
শহরের মহল্লার নাম হলো কৃষ্ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাধবগঞ্জ, রসিকগঞ্জ, মটুকগঞ্জ। তৈরি হলো একাধিক বিষ্ণুমন্দির। মদনমোহন, শ্যামরায়, জোড়বাংলা, রাধাশ্যাম, রাসমঞ্চ। আশপাশের গ্রামগুলিতেও যেন কৃষ্ণ লীলা করতে শুরু করলেন — দ্বারিকা, মথুরা, গোকুল, বৃন্দাবনপুর, রাধানগর, শ্যামরায়পুর। জলাশয়গুলিও যেন সেই স্মৃতির অংশ — যমুনাবাঁধ, কৃষ্ণবাঁধ, শ্যামবাঁধ, লালবাঁধ। গোটা অঞ্চলই হয়ে উঠল এক অলিখিত বৈষ্ণব মানচিত্র।
বিষ্ণুপুরের মন্দিরে চোখ রাখলে বোঝা যায়, এখানে উপাসনা আর শিল্প হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে। প্রতিটি প্যানেলে ফুটে উঠেছে কৃষ্ণের বাল্যলীলা, রাসলীলা, রাধার সঙ্গে প্রেম, গোপী বিহার, পুরাণের নানা আখ্যান। যেন অনুচ্চারে বলে চলেছে, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে।’ এই বিনয়, এই প্রেম কি ভক্তি ছাড়া আসে?
শ্রীনিবাস আচার্যের আগমনের পূর্বে গোটা মল্লভূমে শক্তির উপাসনা চলত বলে জানালেন বিষ্ণুপুরের বিশিষ্ট গবেষক প্রদীপ কর। তাঁর কথায়, ‘মৃন্ময়ী মন্দির সেই ইতিহাসের সাক্ষী দেয়। কিন্তু বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণের পরে বীর হাম্বির বিষ্ণুপুরকে পরিকল্পিত ভাবে বৃন্দাবনের আদলে গড়ে তুলেছিলেন। কৃষ্ণের নামে মন্দির, পুকুর, বাঁধ, মহল্লা — সবই যেন সেই বৃহৎ পরিকল্পনারই অংশ।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু স্থানের নাম পরিবর্তন হয়েছে। দ্বারকা আজ হয়েছে দ্বারিকা, গোকুলজী লোকমুখে গোকুলনগর। প্রদীপ বলছেন, ‘কিন্তু ইতিহাসের সূত্র আজও অটুট।’
শুধু মল্ল রাজপরিবার নয়, হাম্বিরের দেখাদেখি অনেক সামন্ত রাজাও বৈষ্ণব হয়ে যান বলে জানালেন গবেষক তুলসিদাস মাইতি। তাঁর কথায়, ‘এক সময়ে এই অঞ্চলের নাম ছিল বিষাণপুর। বিষ্ণুর উপাসনা বিস্তার লাভ করার পরে ধীরে ধীরে তা বদলে বিষ্ণুপুর হয়।’ শ্যামরায় মন্দিরের টেরাকোটার প্যানেলে রাসলীলার মোটিফ আজও সেই ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে বলে মনে করেন তুলসিদাস মাইতি।
বিষ্ণুপুর রাজবাড়ি আজও তার সাক্ষী। শারদীয়া দুর্গোৎসব-সহ প্রায় সব পুজোই হয় বৈষ্ণব মতে। রাজপরিবারের পুরোহিত সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘শাস্ত্র মেনে পুজো হয়। কিন্তু পশুবলি হয় না। প্রাচীন এই প্রথা আজও চলছে।’ বৈষ্ণব ধর্ম যে শুধু মন্দির নির্মাণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মানুষের জীবনযাত্রাকেই বদলে দিয়েছিল, এ যেন তারই প্রমাণ।
বিষ্ণুপুরকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতির জন্য যে প্রস্তাব পাঠানোর তোড়জোড় চলছে, তার জন্য হেরিটেজ কমিশনের প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যে এলাকায় ঘুরেও গিয়েছেন। প্রাচীন মন্দির সংস্কারের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকারও। এখন শুধু স্বীকৃতি মেলার অপেক্ষা। তা হলে শুধু টেরাকোটার মন্দির নয়, রাস্তা, জলাশয়, গড় — সব কিছুই ফের নতুন সাজে ঝলমল করে উঠবে।
তবে মল্লভূম বিষ্ণুপুর নিছক একটা শহর নয়। এখানে শিল্প ধর্মকে ছুঁয়েছে, ভূগোল ভক্তিকে, আর বিশ্বাস মিশে গিয়েছে প্রতিদিনের জীবনে। শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহে নন, মাটির সোঁদা গন্ধে, টেরাকোটার নীরব ভাষায় নিঃশ্বাস নেন। শেষ বিকেলের নরম আলো যখন শ্যামরায় মন্দিরের গায়ে এসে পড়ে, তখন এক অদৃশ্য বাঁশিওয়ালা কদম গাছের গোড়ায় সুর ধরেন। চরাচর ভেসে যায়। বাতাসে ভেসে বেড়ায় গোপীদের নূপুরের রিনঝিন, ‘স্মর-গরল-খণ্ডনং, মম শিরসি মণ্ডনং, দেহি পদপল্লবমুদারম্...।’