এক নিস্তব্ধ পাহাড়ি পথ। চারদিকে ঘন জঙ্গল, তার বুক চিরে এঁকেবেঁকে উপরে উঠে গিয়েছে রাস্তা। একটি মোটরসাইকেলে চড়ে যাচ্ছিলেন স্বামী, স্ত্রী এবং তাঁদের বছর দু'য়েকের ছোট্ট মেয়ে। আপাতদৃষ্টিতে এটি ছিল সাধারণ এক সুখী পরিবারের চেনা ছবি। সপরিবারে মন্দিরে দেবদর্শনে যাচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু এই শান্ত দৃশ্যের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক নারকীয় ষড়যন্ত্র। মন্দির সফর ছিল আসলে এক সুপরিকল্পিত খুনের ছক। নিজের স্বামীকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিতে প্রতি মুহূর্তের ‘লাইভ লোকেশন’ শেয়ার করছিলেন স্বয়ং স্ত্রী! অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুর জেলায় ঘটেছে এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুর জেলার এই ঘটনা, যা উস্কে দিয়েছে সাম্প্রতিক পুনের লোহাগড় ও মেঘালয়ে হনিমুন মার্ডারের স্মৃতি। পুলিশি তদন্তে দাবি, স্বামীকে খুন করতে নিজের প্রেমিককে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিলেন ১৯ বছরের এক তরুণী। সুচারু ভাবে হত্যাকাণ্ড সম্পন্নের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভিযুক্ত স্ত্রী এবং তাঁর প্রেমিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মৃতের নাম রমেশ। ২৩ বছরের এই তরুণ তামিলনাড়ুর কৃষ্ণগিরি জেলার সুলাগিরির বাসিন্দা। প্রায় দু'বছর আগে অন্ধ্রপ্রদেশের শান্তিপুরমের বাসিন্দা ১৯ বছরের হাসিনির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের কোল আলো করে আসে এক কন্যাসন্তান। আত্মীয়-স্বজনদের চোখে তাঁরা ছিলেন এক আদর্শ দম্পতি। কিন্তু হাসিনির হৃদয়ে স্বামীর প্রতি ভালোবাসার বদলে জ্বলছিল অন্য আগুন।
তদন্তে উঠে এসেছে, বিয়ের পরেও শৈশবের বন্ধু ২০ বছরের যুগন্ধরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন হাসিনি। নিজের বাল্যবন্ধু তথা প্রেমিক যুগন্ধরের সঙ্গে মিলে সে মনে মনে সাজিয়েছিল রমেশকে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর ছক। পরে দু’জনে মিলে রমেশকে খুনের পরিকল্পনা করেন।
পুলিশের অভিযোগ, অমাবস্যার দিন পরিবার নিয়ে মন্দিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন হাসিনি। স্বামীকে রাজি করান পাহাড়ি চূড়ায় অবস্থিত শ্রী মল্লেশ্বর স্বামী মন্দিরে পুজো দিতে যাওয়ার জন্য। সরল বিশ্বাসে রমেশ তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নিজের বাইকে চড়ে রওনা দেন। পথে তিনি ফোন থেকে প্রেমিক যুগন্ধরকে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠান। এই লোকেশন ট্র্যাক করেই অভিযুক্ত যুগন্ধর পাহাড়ি পথে কিছুটা এগিয়ে ওঁত পেতে থাকার সুযোগ পান।
নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে নিজের হ্যান্ডব্যাগ ফেলে হামলার সঙ্কেত দেওয়া হবে বলে হাসিনি আগেই প্রেমিককে জানিয়েছিলেন। এমনই তথ্য পুলিশের সামনে উঠে এসেছে। অভিযুক্ত হাসিনি ও তাঁর প্রেমিক খুনের জন্য বেছে নেন পাহাড়ের সেই নির্জন পথের সরু এক বাঁক। পরিকল্পনা মতো নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে চলন্ত বাইক থেকে হঠাৎ নিজের হাতব্যাগটি রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেন তিনি।
‘ব্যাগটা পড়ে গেল!’, হাসিনির এই আর্তনাদ শুনেই সরল মনে বাইক থামিয়ে দেন রমেশ। এমনকী নিজে নেমে ব্যাগটা আনতে যেতেই ধারালো অস্ত্র নিয়ে রমেশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যুগন্ধর। বেশ কয়েকজন ভাড়াটে গুন্ডাও তাঁর সঙ্গে ছিল। খুদে শিশুকন্যার সামনেই কুপিয়ে খুন করা হয় রমেশকে।
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের ডিজিটাল তথ্য এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের সাহায্যে দ্রুত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পায়। তদন্তে হাসিনি ও যুগন্ধরের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের তথ্যও সামনে আসে। এর পরেই দু’জনকেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ঘটনা বিস্তারিত জানতে তাদের জেরা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুন এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র-সহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার নেপথ্যে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।