• করোনেশন সেতু আজও ইঞ্জিনিয়ারিং বিস্ময়ের নিদর্শন
    আজকাল | ১৭ জুলাই ২০২৬
  • প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন সেবকের করোনেশন সেতু অতিক্রম করে, কিন্তু খুব কম মানুষই তাঁদের চাকার নীচে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং কীর্তিটির কথা ভাবেন। অথচ তিস্তা নদীর ওপর স্থাপিত এই মনোরম আর্চ সেতু কেবল একটি যোগাযোগের পরিকাঠামো নয়; এটি ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। ১৯৪১ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার ৮৫ বছর পরও এই সেতু প্রমাণ করে যে প্রযুক্তির বাহুল্য নয়, বরং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দক্ষ প্রকৌশলই এমন অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে, যা সময়ের কঠিন পরীক্ষায়ও অটল থাকে।

    বিশ্বখ্যাত সেবক কালীমন্দিরের পাশেই অবস্থিত এই সেতু উত্তরবঙ্গের সমতলভূমি থেকে কালিম্পং, সিকিম ও ডুয়ার্স অঞ্চলে প্রবেশের প্রধান দ্বার। পূর্ব হিমালয়ের সবুজ পাহাড় এবং দ্রুতগামী তিস্তা নদীর মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘেরা এই সেতু যেমন ইঞ্জিনিয়ারদের বিস্মিত করে, তেমনি ইতিহাসবিদ ও পর্যটকদেরও সমানভাবে আকৃষ্ট করে। স্থানীয় মানুষের কাছে ‘বাঘ পুল’ নামে পরিচিত এই সেতু আজ উত্তরবঙ্গের এক স্থায়ী প্রতীক।

    ১৯৩০-এর দশকে তিস্তা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ ছিল এক অত্যন্ত দুরূহ কাজ। প্রবল স্রোত, গভীর গিরিখাত এবং অনিয়ন্ত্রিত বন্যার জন্য নদীর তলদেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে পিলার নির্মাণ কার্যত অসম্ভব ছিল। এই পরিস্থিতিতে ইঞ্জিনিয়াররা গ্রহণ করেন এক সাহসী ও যুগান্তকারী সমাধান— নদীর দুই তীরের শক্ত শিলাস্তরে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত একটি একক-স্প্যানের ওপেন-স্প্যান্ড্রেল রিইনফোর্সড কংক্রিট আর্চ। এর ফলে নদীর মধ্যে কোনও মধ্যবর্তী স্তম্ভ নির্মাণের প্রয়োজন হয়নি। বন্যার জল ও ভাসমান ধ্বংসাবশেষ বাধাহীনভাবে সেতুর নীচ দিয়ে প্রবাহিত হতে পেরেছে এবং পুরো কাঠামোর ভার নিরাপদে স্থানান্তরিত হয়েছে দুই তীরের শক্ত শিলাস্তরে।

    সেতুটির প্রধান আর্চের বিস্তার প্রায় ৮১.৭ মিটার, যা নির্মাণকালের প্রেক্ষাপটে ভারতের অন্যতম বৃহৎ রিইনফোর্সড কংক্রিট আর্চ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রকল্পটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন ব্রিটিশ প্রকৌশলী জন চেম্বার্স। নকশার উন্নয়ন ও প্রকৌশলগত পরিমার্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন বাঙালি ইঞ্জিনিয়ারির এ. সি. দত্ত, এস. কে. ঘোষ এবং কে. পি. রায়। জে. সি. গ্যামন সংস্থার নির্মাণে প্রায় ৪ থেকে ৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে সম্পন্ন এই প্রকল্প এমন এক সময়ে বাস্তবায়িত হয়েছিল, যখন কম্পিউটার, উন্নত স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস সফটওয়্যার কিংবা আধুনিক নির্মাণযন্ত্রের কোনও অস্তিত্বই ছিল না। তবুও এটি সেই যুগের অসাধারণ প্রকৌশল দক্ষতার এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য।

    আর্চ সেতুতে লোড স্থানান্তর এবং বলের প্রবাহ। 

    এই সেতুর অসামান্য স্থায়িত্বের নেপথ্যে রয়েছে একটি সহজ, অথচ শক্তিশালী প্রকৌশল-দর্শন। প্রচলিত বিম সেতুতে ভার বহনের প্রধান উপায় হল কাঠামোর বাঁকন (বেন্ডিং) প্রতিরোধ করা। কিন্তু করোনেশন সেতুতে অধিকাংশ ভার আর্চের সংকোচন (কম্প্রেশন) শক্তির মাধ্যমে দুই প্রান্তে স্থানান্তরিত হয়। যানবাহনের ওজন আর্চের মাধ্যমে দুই প্রান্তের বিশাল শিলা-ভিত্তিক অ্যাবাটমেন্টে স্থানান্তরিত হয়, ফলে কংক্রিট তার সর্বোচ্চ সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। পাশাপাশি ওপেন-স্প্যান্ড্রেল নকশা সেতুর নিজস্ব ওজন কমিয়ে কাঠামোটিকে আরও কার্যকর, অর্থনৈতিক এবং দীর্ঘস্থায়ী করেছে।

    গত আট দশকেরও বেশি সময়ে এই সেতু অসংখ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। প্রবল বন্যা, ২০১১ সালের সিকিম ভূমিকম্প এবং ২০২৩ সালের বিধ্বংসী তিস্তা হিমবাহ হ্রদ ভেঙে সৃষ্ট বন্যা (Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF)— সবকিছুই সফলভাবে সামলে নিয়েছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। যদিও বয়ঃজনিত অবক্ষয়ের কারণে সময়ে সময়ে এর কাঠামোগত পরিদর্শন করা হয়েছে এবং ভারী যান চলাচলে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তবুও আজও এটি তার অপরিহার্য ভূমিকা দক্ষতার সঙ্গে পালন করে চলেছে। ভবিষ্যতের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য করোনেশন সেতু এক জীবন্ত শিক্ষাগার। এটি শেখায় যে সেতুর ভিত্তি পরিকল্পনার আগে ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য গভীরভাবে বোঝা কতটা জরুরি; নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহকে বাধা না দিয়ে তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নকশা তৈরি করাই অধিক কার্যকর; এমন কাঠামোগত রূপ নির্বাচন করতে হবে, যা দক্ষতার সঙ্গে ভার স্থানান্তর করতে সক্ষম; এবং সর্বোপরি, অবকাঠামোকে প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতে নয়, বরং সহাবস্থানে নির্মাণ করতে হবে। আধুনিক সেতু তৈরির ক্ষেত্রেও এই মৌলিক নীতিগুলি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

    ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দিতে করোনেশন সেতুর সমান্তরালে নতুন একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে চলেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এই ঐতিহাসিক সেতুকে কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে নয়, বরং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক জীবন্ত পাঠশালা হিসেবে সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মহান স্থাপত্যের মূল্যায়ন কোনও সেতুর উচ্চতা বা প্রযুক্তিগত জটিলতায় নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিরাপদ, টেকসই ও নির্ভরযোগ্যভাবে মানুষের সেবা করার সক্ষমতায় নিহিত।

    করোনেশন সেতুর দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত পুনর্বাসন, শক্তিবৃদ্ধি এবং স্মার্ট পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে ক্ষয়প্রাপ্ত কংক্রিট ও মরচে ধরা রডের মেরামত, নির্বাচিত স্থানে কার্বন ফাইবার রিইনফোর্সড পলিমার (CFRP) কম্পোজিটের মাধ্যমে শক্তিবৃদ্ধি, উন্নত জলরোধী ও নিকাশিব্যবস্থা, ক্ষয়রোধী সুরক্ষা এবং ভূমিকম্প-সহনশীলতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা সেতুর কার্যক্ষম আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে সক্ষম। একই সঙ্গে স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং (SHM) প্রযুক্তি প্রয়োগ করে সেতুটিকে একটি ‘স্মার্ট ব্রিজ’ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। স্ট্রেন, কম্পন, স্থানচ্যুতি, তাপমাত্রা এবং ফাটলের বিস্তার পরিমাপকারী সেন্সর থেকে প্রাপ্ত তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ, ড্রোন-পরিদর্শন এবং ডিজিটাল টুইন প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বিত হলে সম্ভাব্য কাঠামোগত দুর্বলতা আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর ফলে রক্ষণাবেক্ষণ হবে আরও বৈজ্ঞানিক, ব্যয়-সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। এমন উদ্যোগ করোনেশন সেতুকে শুধু দীর্ঘস্থায়ী করবে না, বরং ভারতের ঐতিহাসিক সেতুগুলির আধুনিক সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

    আধুনিক স্মার্ট ব্রিজ প্রযুক্তির একটি ধারণাগত উপস্থাপনা। এটি কোনো প্রকৃত প্রকৌশল নকশা নয়; বরং সেতুর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে AI, IOT ও বিভিন্ন সেন্সর প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগের একটি রেফারেন্স চিত্র। 

    প্রতিটি প্রজন্মের ইঞ্জিনিয়াররা পূর্বসূরিদের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যকে ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের পরিকাঠামো নির্মাণ করেন। এখন সেই যাত্রাপথে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তির নতুন দিগন্ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সেন্সর নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল টুইন, উন্নত নির্মাণসামগ্রী, রোবোটিক্স এবং স্মার্ট সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে পরিকাঠামোর পরিকল্পনা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রচলিত ধারণা। তবে প্রযুক্তি কখনও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মৌলিক নীতির বিকল্প নয়; বরং সেই ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, উন্নত নিরাপত্তা এবং দীর্ঘস্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণে এই প্রযুক্তির ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। আগামী দিনের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং তাই এমন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটিয়ে গড়ে উঠবে আরও বুদ্ধিদীপ্ত, স্থিতিস্থাপক ও টেকসই পরিকাঠামো। 

    করোনেশন সেতু শুধু একটি ঐতিহাসিক সেতু নয়; এটি এমন এক প্রকৌশল-দর্শনের প্রতীক, যা প্রমাণ করে— সঠিক পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে একটি অবকাঠামো যুগের পর যুগ মানুষের আস্থা বহন করতে পারে। 

    লেখক- শ্রী প্রীতম সিংহ (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, ডিপার্টমেন্ট অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, শিলিগুড়ি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি)

    ড. প্রিয়দর্শিনী সাহা চৌধুরী (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, ডিপার্টমেন্ট অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, শিলিগুড়ি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি)
  • Link to this news (আজকাল)