সরকারি প্রকল্পে সর্বহারা মধ্যপ্রদেশের আদিবাসীরা! জমি-জঙ্গল হারিয়ে ১২দিন ধরে অনশনে গোটা গ্রাম
প্রতিদিন | ১৭ জুলাই ২০২৬
কোমর সমান জলে গলায় ফাঁস লাগিয়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মহিলারা। নদীর পাড়ে চিতা সাজিয়ে তাতে শুয়ে রয়েছেন গ্রামের পুরুষরা। উন্নয়নের যাঁতাকলে সর্বস্ব খুইয়ে গত ১২ দিন ধরে এভাবেই অনশন করছেন মধ্যপ্রদেশের ছাতারপুরে একাধিক গ্রামের আদিবাসী মানুষজন। গোটা গ্রাম যেহেতু অনশনে, তাই বাড়িতে হাড়ি চড়ানোর কেউ নেই, অভুক্ত ৫০০-র বেশি মানুষ। আদিবাসীদের বক্তব্য, জমি-জঙ্গল হারিয়ে বেঁচে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে মৃত্যু ভালো।
এই ঘটনার সূত্রপাত সরকারের এক প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। তা হল ‘কেন-বেতওয়া রিভার লিঙ্ক প্রোজেক্ট’। যার মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য হল, কেন নদীর অতিরিক্ত জল বেতওয়া নদীতে পাঠানো। দুই নদীর সংযোগের জেরে জলসংকট ঘুঁচবে বুন্দেলখণ্ডের। তবে এই প্রকল্পের বিরোধিতায় সোচ্চার হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি, পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মীরা। অভিযোগ, এই প্রকল্পের জেরে স্থানীয় আদিবাসীদের জমি, জীবন ও সংস্কৃতি বিপন্ন হবে। হাজার হজার পরিবার উচ্ছেদের মুখে পড়বেন। কাটা পড়বে কয়েক লক্ষ গাছ। এখানেই শেষ নয়, পান্না টাইগার রিজার্ভের বড় অংশ ধ্বংস হবে। সরকারের উন্নয়নের জেরে ধ্বংসের মুখে ওই অঞ্চলের ২১টি গ্রাম।
গুরুতর এই পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীদের অভিযোগ, সরকার তাঁদের জমি ও জঙ্গল ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এমনকী পুনর্বাসন দিচ্ছে না। সরকারের অবশ্য দাবি, পরিবারগুলিকে ৫ লক্ষের পরিবর্তে ১২.৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। তবে গ্রামবাসীদের অভিযোগ, নতুন জীবন শুরু করার জন্য এই ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত নয়। পাশাপাশি বহু পরিবার পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। অযোগ্যরা সুবিধা পেয়েছেন, দালালদের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের টাকা পাচার করা হয়েছে। এমনকী পুনর্বাসন তালিকায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিরই নাম রাখা হয়নি। সরকারের এই প্রকল্পের বিরুদ্ধেই আমৃত্যু অনশনে বসেছেন স্থানীয় সমাজকর্মী অমিত ভাটনগর। শুক্রবার ১২ দিনে পড়েছে তাঁদের সেই অনশন। অমিতের পাশে দাঁড়িয়ে অনশনে যোগ দিয়েছেন বিপুল সংখ্যায় গ্রামের মহিলা ও পুরুষরা। বাদ যায়নি পড়ুয়ারাও। অভিযোগ, অনশন শুরু করার পর থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও চিকিৎসককে পাঠানো হয়নি। গত ১১ দিনে ৬ কেজি ওজন কমেছে অমিতের। অসুস্থ বাকিরাও।
এদিকে সরকারের দাবি, ‘নতুন করে সমীক্ষার পর ৭৫০টি পরিবারকে নতুন করে পুনর্বাসনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক। আগে ক্ষতিপূরণ ৫ লক্ষ ছিল, সেটা বাড়িয়ে ১২.৫ লক্ষ করা হয়েছে। ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ করেছে সরকার। তবে এতেও সন্তুষ্ট নন আন্দোলনকারীরা।’ এদিকে আন্দোলনকারীদের দাবি, এই লড়াই শুধু ক্ষতিপূরণের জন্য নয়, এটা তাঁদের জমি, জীবিকা, বন, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের পরিচয় রক্ষার আন্দোলন। উন্নয়নের নামে তাঁদের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতিকে বলি দেওয়া চলবে না। প্রকল্প স্থগিত না করা পর্যন্ত আন্দোলন জারি থাকবে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সাল থেকে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে আসছেন গ্রামবাসীরা। চলতি বছরের এপ্রিলে দেশজুড়ে চর্চায় উঠে এসেছিল তাঁদের ‘চিতা আন্দোলন’। সেবার চিতায় শুয়ে প্রতিবাদে নেমেছিলেন গ্রামবাসীরা। সেবার অবশ্য গ্রামবাসীদের আশ্বস্ত করে আন্দোলনে দাঁড়ি টেনেছিল সরকার। তবে কোনও প্রতিশ্রুতি পালন না হওয়ায় ফের বড় পরিসরে আন্দোলনে নামলেন গ্রামবাসীরা।