একদল ছেলেমেয়ে গবাদি পশুদের যত্ন নিতে ব্যস্ত। কাছেই কয়েকজন বাগান পরিচর্যা করছেন। একটু দূরেই পাথরের চাতালের উপরে এক চিলতে রোদ এসে পড়েছে। চাদর বিছিয়ে সেখানেই কোরিয়ান কিমচি আর লাদাখি আচার তৈরিতে মগ্ন কয়েকজন। ‘সি লেভেল’ বা সমুদ্রতল থেকে প্রায় ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির কাছাকাছি। কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার স্রোত বয়ে চলে সর্বক্ষণ। রুক্ষ পাহাড়ি উপত্যকায় প্রতিকূলতা দরজায় কড়া নাড়ে প্রতি মুহূর্তে। তার মধ্যেও একদল ছেলেমেয়ের মুখে সর্বদা মনভোলানো হাসি, দেহে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের শক্তি। সেখানে ভুল করলে শাস্তি নেই, বকা খেলেও মন খারাপের বালাই নেই। প্রকৃতির কোলে জীবনশৈলির শিক্ষাঙ্গন। হ্যাঁ, নামে স্কুল। তবে পড়ুয়া নয়, মানুষ তৈরির পাঠশালা।
লেহ (Leh) থেকে কমবেশি ১৬ কিমি দূরে পাহাড়ি গ্রাম ‘ফে’ (Phey)। যতটা রুক্ষ, ঠিক ততটাই মনোরম, রঙিন — নয়নাভিরাম। সেখানেই কয়েকজন কলেজ ছাত্রকে নিয়ে ১৯৮৮ সালে এই শিক্ষাঙ্গন, থুড়ি মুক্তাঙ্গন, তৈরি করেছিলেন ক্লাইমেট অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বাল্যকাল হইতেই আমাদের শিক্ষার সহিত আনন্দ নাই। কেবল যাহা কিছু মুখস্থ করিতে হয়, তাহাই মাথার উপর বোঝা হইয়া চাপিয়া বসে।’ অনেকটা সেই ভাবনাতেই প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে প্রকৃতির পাঠ শোনা, সেটাকে আত্মস্থ করে স্বনির্ভর হয়ে ওঠার শিক্ষা দিতেই সোনম তৈরি করেছিলেন Students’ Educational and Cultural Movement of Ladakh (SECMOL)।
‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ডঃ বীরু সহস্ত্রবুদ্ধি বলতেন, ‘জীবন তো একটা দৌড়ের প্রতিযোগিতা। তুমি জোরে না দৌড়লে, কেউ তোমাকে টপকে এগিয়ে যাবে।’ সোনমের স্কুল শেখায়, দৌড়ে যে পিছিয়ে, তাঁকেও সাহায্য করো, তাঁকেও জোরে দৌড়নোর জন্য সাবলম্বী করে তোলো। শেখা হবে ‘আমার জন্য নয়, আমাদের জন্য’। সোনমের এই স্কুলে ক্যাম্পাসের প্রশাসন, রান্নাঘর, পরিচ্ছন্নতা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছাত্রছাত্রীরাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। পড়ুয়াদের রাজত্বে ছাত্রছাত্রীরাই শিক্ষক। স্কুল পরিচালনার জন্য যে শিক্ষকরা রয়েছেন, তাঁরা আদতে মেন্টর। তাঁদের কাজ, পড়ুয়াদের ব্যর্থতার খাদ থেকে টেনে তুলে সাফল্যের রাস্তায় হাঁটতে শেখানো। প্রচলিত পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া বহু ছাত্রছাত্রী এই স্কুলে এসে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন।
গোটা ক্যাম্পাসটি মূলত সৌরশক্তির উপর নির্ভরশীল। রান্নাবান্না, স্কুলের আলো ও হিটারের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। ২০১৩-১৪ সালে বায়োগ্যাস ডাইজেস্টার ও রকেট স্টোভ তৈরি করে স্কুলটি। বাণিজ্যিক মানের সোলার ওয়াটার হিটার স্থাপন করা হয়। স্কুলে রয়েছে ‘আইস টাওয়ার’, যা শীতকালীন জল সংরক্ষণের কাজে লাগে। এ ছাড়াও রয়েছে সোলার ওয়াটার পাম্প, সৌরবিদ্যুৎ পরিচালিত ডাইনিং ও ইভেন্ট হল।
বই-খাতায় ঠাসা ব্যাগ পীঠে নিয়ে ক্লাসে যাওয়া, মুখস্থবিদ্যা উগরে দেওয়া, হোম টাস্ক, ক্লাস টেস্ট, র্যাঙ্ক — এ সবের ঊর্ধ্বে গিয়ে কৃষিকাজ, নির্মাণকাজ, সৌরশক্তি ব্যবস্থাপনা, জল সংরক্ষণ — বাস্তব সমস্যার সমাধানের পাঠ শেখানো হয় এই স্কুলে। গুরুত্ব দেওয়া হয় দক্ষতা ও সৃজনশীলতার উপরে। শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রতিভা বিকাশে উৎসাহিত করা হয়। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভোটাভুটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়। শিক্ষার্থীদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ, ফি সংগ্রহ, দোকান পরিচালনা, খাদ্যসামগ্রী কেনা, গবাদি পশুর যত্ন নেওয়া, বাগান করা।
এর পাশাপাশি গান, নাচ, বিতর্ক, কুইজ় প্রতিযোগিতা, ভলিবল, ক্রিকেট, ফুটবল, আইস স্কেটিং শেখা, লাদাখি ভাষায় সংবাদ বোঝা ও আলোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। স্কুলেই দেখানো হয় লাদাখি, ইংরেজি, হিন্দি ও অন্যান্য ভাষার বিভিন্ন চলচ্চিত্র। এখানেই শেষ নয়, অ্যাপ্রিকট জ্যাম, লাদাখি আচার, কোরিয়ান কিমচির মতো শীতকালীন আঞ্চলিক খাবার তৈরিও শিখে নিতে পারেন পড়ুয়ারা।
লেহ, কার্গিল, জাংস্কার এবং পাদ্দার (জম্মুর কিশতেওয়ার এলাকা) থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসেছেন। স্কুলে পড়ার একমাত্র শর্ত হলো তাদের লাদাখি ভাষায় যোগাযোগ করতে সক্ষম হতে হবে। কার্গিল, জাংস্কার, স্পিতি ও পাদ্দারের মতো যে সব এলাকার ভাষা লাদাখির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে সম্পর্কযুক্ত, সেই সব এলাকার শিক্ষার্থীর দল খুব দ্রুতই (কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যেই) লেহ-র আঞ্চলিক উচ্চারণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। প্রচলিত স্কুলে ‘ফেল’-করা শিক্ষার্থীরাও এই স্কুলে এসে ভর্তি হতে পারেন।
হয়তো পড়ার সুযোগ হবে না, তবে লাদাখ বেড়াতে গেলে একবার দেখেই আসতে পারেন সেই স্কুল। লেহ এয়ারপোর্টের কাছ থেকে গাড়ি ভাড়া করে আধ ঘণ্টার দূরত্বে ঢুঁ মারতে পারেন এই স্কুলে। উল্লেখ্য, অনেকেই ভাবেন রাজকুমার হিরানির ‘থ্রি ইডিয়টস’-এ এই স্কুলের চিত্রই তুলে ধরা হয়েছিল। এমনকী, র্যাঞ্চো চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুকের অনুকরণে তৈরি। তবে সম্প্রতি সোনম নিজেই জানিয়েছেন, SECMOL স্কুলের দৃশ্য আদৌ সিনেমায় দেখানো হয়নি। অন্য একটি স্কুলে এই সিনেমার কিছু অংশ শ্যুট করা হয়। সিনেমার নায়ক আমির ‘ব়্যাঞ্চো’ খান জানিয়েছেন, তাঁর চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুকের উপরে ভিত্তি করে নয়।