• পঙ্কজ, ভজনকে সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টায় হাত শিবির
    এই সময় | ১৮ জুলাই ২০২৬
  • দেবাশিস দাস

    এ যেন শিকড়ে ফেরার গান।

    টালিগঞ্জ, যাদবপুরে কংগ্রেসের শক্তিক্ষয় শুরু হয়েছিল তৃণমূলের প্রতিষ্ঠা হওয়া ইস্তক। যখন দলের স্থানীয় নেতা–কর্মীদের একটা বড় অংশ নিজেদের দলীয় কার্যালয় সমেত তৃণমূলে যোগ দেন। আর তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে দলের শক্তি কার্যত তলানিতে ঠেকে উদ্বাস্তু কলোনি প্রভাবিত টালিগঞ্জ ও যাদবপুর এলাকায়। কংগ্রেসের পতাকা ধরা, দেওয়াল লেখার লোক ওই তল্লাটে গত দেড় দশকে খুঁজতে হয়েছে দূরবীন দিয়ে। তবে রাজ্যে এ বার রাজনৈতিক পালাবদলের পটভূমিকায়, তৃণমূল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে দক্ষিণ শহরতলির ওই দুই তল্লাটে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা কংগ্রেস শুরু করল প্রয়াত দুই নেতাকে সামনে রেখে। পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভজন নাগ। কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল তৈরি হওয়ার পরে ওই দু’জনই অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে যোগ দেন। টালিগঞ্জের মোট তিন বারের বিধায়ক পঙ্কজ শেষ বার, ২০০১ সালে জোড়াফুলের টিকিটেই নির্বাচিত হন এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা।

    গত রবিবার, ১২ জুলাই কংগ্রেস বিজয়গড়ের নিরঞ্জন সদন ভাড়া করে দিনভর দক্ষিণ কলকাতা জেলা কর্মী সম্মেলন করেছে। দলের দুর্দিনেও হাতে গোনা যে কর্মীরা কংগ্রেসের পতাকা ধরে রেখেছিলেন, তাঁরা কেউ মনে করতে পারছেন না, ১৯৯৭ সালের পরে শেষ কবে টালিগঞ্জ–যাদবপুরে কংগ্রেস হইহই করে, হল ভাড়া করে কর্মী সম্মেলন করেছে। যাদবপুরের দীর্ঘদিনের কংগ্রেসকর্মী শচীন দাসের কথায়, ‘এই এলাকায় আমি প্রায় চার দশক ধরে কংগ্রেসি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তবে সাম্প্রতিক কালের মধ্যে আমার দলের এত বড় কর্মী সম্মেলনের কথা আমি মনে করতে পারছি না। ’

    ওই সম্মেলন–মঞ্চের নামকরণ করা হয়েছিল পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে আর ভজন নাগের নামে সম্মেলনস্থলের নামকরণ করা হয়। ভজন পরিচিত ছিলেন যাদবপুরের বিজয়গড় কলোনিতে কংগ্রেসের উদ্বাস্তু নেতা হিসেবে। দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের তরফে দাবি করা হয়েছে, রবিবারের সম্মেলনে অন্তত এক হাজার প্রতিনিধি যোগ দিয়েছেন। সম্মেলনের বক্তা ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও প্রাক্তন সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য প্রমুখ। ওই কর্মী সম্মেলনে ১৯৯৩–এর ২১ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত কংগ্রেসকর্মী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারের সদস্যরাও যোগ দেন।

    প্রধানত পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরে টালিগঞ্জ–যাদবপুরের কংগ্রেসের নেতা–কর্মীদের বড় অংশ যোগ দেন তৃণমূলে। ২০০৬–এর বিধানসভা ভোটের আগে পঙ্কজ ঘোষণা করেন, তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছেন। পরবর্তী সময়ে, ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে পঙ্কজ প্রকাশ্যে না–হলেও ভিতরে ভিতরে তাঁর পুরোনো দল কংগ্রেসকে (সে বার কংগ্রেস ও বামেদের জোট হয়েছিল) সাহায্য করছেন বলে তৃণমূলের কোনও কোনও অংশ থেকে দাবি করা হয়। ২০১৮–তে পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পরে টালিগঞ্জে ‘পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতিরক্ষা কমিটি’–ও তৈরি হয়েছিল। দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক দেবশুভ্র মজুমদার বলছেন, ‘পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে অন্য দলে গিয়েছিলেন ঠিকই। তবে তিনি এক সময়ে কংগ্রেসেরই নেতা ছিলেন। টালিগঞ্জ, যাদবপুরের কংগ্রেস রাজনীতিতে পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান অস্বীকার করা যাবে না।’

    মূলত গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে যাদবপুর–টালিগঞ্জের কলোনি অঞ্চলে কংগ্রেসের বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে এসেছিলেন ভজন নাগ। উদ্বাস্তু কলোনিতে ভজনের নাম আজও পুরোনো বাসিন্দাদের অনেকে মনে রেখেছেন। ভজনের দুই ছেলে প্রদ্যোৎ ও প্রসেনজিৎ নাগ জানান, বাবার মতো তাঁরাও তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন, এতদিন তাঁরা তৃণমূল–ই করতেন। তবে প্রসেনজিতের বক্তব্য, ‘তৃণমূল করলেও আমাদের রাজনৈতিক শিকড় ছিল কংগ্রেসেই। তাই, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা কংগ্রেসেই ফিরে এসেছি।’ দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের সভাপতি প্রদীপ প্রসাদ বলছেন, ‘টালিগঞ্জ–যাদবপুরে কংগ্রেসের শক্তি প্রতিষ্ঠায় পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় এক সময়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। ভজন নাগও সংগঠনের প্রসারে নিরলস কাজ করেছেন। তাই, ওই দুই প্রয়াত নেতাকে সামনে রেখেই আমরা কর্মী সম্মেলনে পরিকল্পনা করেছিলাম। তাতে উদ্বাস্তু প্রভাবিত এলাকায় সাড়াও মিলেছে। ওই দুই নেতাকেই সামনে রেখে আমরা সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজ করব।’

  • Link to this news (এই সময়)