জগন্নাথ দেবের পুজোর ফুল কিনতে গিয়ে নিখোঁজ, ৪ বছর পর রথের পুণ্যতিথিতেই ফিরলেন হারানো মা!
News18 বাংলা | ১৮ জুলাই ২০২৬
: হ্যাম রেডিওর সাহায্যে মুর্শিদাবাদ থেকে ওড়িশা ঘরে ফিরলেন বেলা বেহারা। প্রায় চার বছর আগে জগন্নাথদেবের পুজোর ফুল কিনতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন ওড়িশার গঞ্জাম জেলার বাসিন্দা, পেশায় ফুল বিক্রেতা বেলা বেহেরা (৭৬)। তারপর যেন আচমকাই হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ছেলেরা থানা, হাসপাতাল, আত্মীয়দের বাড়ি সব জায়গায় খুঁজেও হন্যে হয়ে ফিরেছেন।
মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের তকিয়া কেন্দ্রীয় সরকারি সিনিয়র সিটিজেন হোমে আশ্রয় নেওয়া বেলা বেহেরা অবশেষে তাঁর ছোট ছেলের হাত ধরে ওড়িশার গঞ্জামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। ভাষাগত বিভ্রান্তি ও স্মৃতিভ্রমের কারণে ওড়িশা থেকে কীভাবে যে তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছিলেন, তা আজও স্পষ্ট নয়। অচেনা শহরে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরার সময় মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। আদালতের নির্দেশে প্রথমে বেলডাঙা এবং পরে জিয়াগঞ্জের তকিয়া সিনিয়র সিটিজেন হোমে তাঁর ঠাঁই হয়। আশ্রমের সকলের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘করুণা মাসি’ নামে। ওড়িয়া ভাষা ছাড়া অন্য কিছু না বলতে পারায় এবং নিজের ঠিকানা স্পষ্ট করতে না পারায় বছরের পর বছর তাঁর পরিচয় অধরাই থেকে যায়। টুইস্ট আসে চার মাস আগে, যখন এই বৃদ্ধাশ্রমে আবাসিক সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে যোগ দেন অর্পিতা লাহিড়ী। ভোরবেলা বৃদ্ধার একা বসে চোখ মোছা আর অচেনা ভাষায় গুনগুন করে গান গাওয়া তাঁর নজর কাড়ে। মায়ের বাড়ি ফেরার আকুতি বুঝতে পেরে তিনি নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেন।
সুপারিন্টেন্ডেন্ট অর্পিতা লাহিড়ী বলেন, সূত্র বলতে ছিল মাত্র কয়েকটি অস্পষ্ট শব্দ— ‘গঞ্জাম’, ‘গোপালপুর’, ‘বহরমপুর’ এবং তাঁর স্বামীর ‘বড় গাঙে’ মাছ ধরার স্মৃতি। এরই মধ্যে বহরমপুরের মুর্শিদাবাদ সিজেএম আদালত বৃদ্ধাকে দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলে অর্পিতা দেবী যোগাযোগ করেন ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল হ্যাম রেডিও ক্লাব’-এর সঙ্গে। ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস ও তাঁর সহকর্মীরা ওড়িশার সাংবাদিকদের সহায়তায় বৃদ্ধার ছবি ও স্মৃতির টুকরোগুলো মিলিয়ে খোঁজ চালাতে থাকেন। অবশেষে সন্ধান মেলে গঞ্জামি জেলার বাড়ির এবং তাঁর ছোট ছেলে কেশব বেহেরার। ভিডিও কলে চার বছর পর মায়ের মুখ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ছেলে। ওড়িশা থেকে জিয়াগঞ্জে পৌঁছন ছোট ছেলে কেশব। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর মা-ছেলের এই আবেগঘন পুনর্মিলনের সাক্ষী থাকেন আশ্রমের কর্মী থেকে আবাসিকরা। অবশেষে ওড়িশার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার সময় আবেগ সামলাতে পারেননি অর্পিতা লাহিড়ীও।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, এর মধ্যেই রয়ে গেছে এক চরম বেদনাদায়ক খবর। বেলা দেবীর বৃদ্ধা মা মাত্র কয়েক দিন আগেই মারা গিয়েছেন, যিনি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত শেষবার মেয়ের দেখা পেতে ব্যাকুল ছিলেন। বিদায়বেলায় অশ্রুসজল চোখে ছোট ছেলে কেশব বলেন, “এ জগন্নাথদেবেরই কৃপা। প্রভুই আপনাদের দূত করে পাঠিয়েছেন।” এই অলৌকিক পুনর্মিলনকে নিছক কাকতালীয় বলে মানতে পারছেন না অনেকেই। চার বছরের অপেক্ষা আর অগণিত অশ্রুর শেষে, মা-ছেলের এই ঘরে ফেরা যেন সত্যিই আনন্দের।