• ‘আমাকে নিয়ে চলো...’, বাবাকে দেখেই বলল দময়ন্তী, কেন ছেড়েছিল বাড়ি?
    এই সময় | ১৮ জুলাই ২০২৬
  • টানা দু’দিন নিখোঁজ থাকার পরে অবশেষে সন্ধান মিলল হাওড়ার প্রতিভাবান রাইফেল শুটার দময়ন্তী সেনের। ১৫ বছরের এই কিশোরীর নিখোঁজ রহস্যের অবসান ঘটল শনিবার সকালে। ৪৮ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস উৎকণ্ঠার পরে এ দিন হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর গঙ্গার ঘাট এলাকা থেকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে দময়ন্তী সেনকে। কিন্তু কেন বাড়ি ছেড়েছিল প্রতিভাবান এই শুটার? তার ইঙ্গিত দিলেন তাঁর বাবা ধ্রুবজ্যোতি সেন।

    এ দিন সকালে এক প্রাতঃভ্রমণকারী খবর দেন দময়ন্তী হাওড়ার রামকৃষ্ণ ঘাটের জেটিতে রয়েছে। সেই খবর পেয়েই সেখানে ছুটে যান তাঁর বাবা। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন লঞ্চঘাটের টিকিট কাউন্টারের কাছে এক কোণে বসছে কাঁদছে তাঁর মেয়ে।

    ​দময়ন্তীকে দেখা মাত্রই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি বাবা ধ্রুবজ্যোতি সেন। তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে তিনি বলেন, ‘মা তুই কী চাস!’ বাবাকে সামনে পেয়ে তখন দময়ন্তীর চোখের জলও বাঁধ মানেনি। কাঁদতে কাঁদতেই সে বাবাকে বলে, ‘আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো।’

    দু’দিন ধরে চলা চরম মানসিক যন্ত্রণার পরে মেয়ে ঘরে ফেরায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে পরিবার। দময়ন্তীর বাবা ধ্রুবজ্যোতি সেন বলেন, ‘আমার মেয়েকে ফিরে পেয়েছি। আমি খুবই খুশি। আজ ভোরে একজন ব্যক্তি আমাকে ফোন করে জানান যে, তিনি রামকৃষ্ণপুর গঙ্গার ঘাটে আমার মেয়েকে দেখেছেন। এর পরে আমি সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গার ঘাটের দিকে রওনা দিই এবং চারদিকে খুঁজতে থাকি। শেষ পর্যন্ত লঞ্চঘাটের টিকিট কাউন্টারের কাছে আমার মেয়েকে পাই। আমাকে দেখেই সে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। পুলিশকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।’

    ৪৮ ঘণ্টা বাড়িছাড়া দময়ন্তী সেন। তার সুস্থ ভাবে বাড়ি ফেরার পরে তার নিখোঁজ হওয়ার কারণ নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। তার বাবা ধ্রুবজ্যোতি সেনের মতে, খেলা, পড়াশোনা, নিজের অ্যাম্বিশনের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারছিল না ১৫-এর কিশোরী দময়ন্তী। কিশোরী মনের খেয়ালে সেই চাপ থেকেই নিজেকে ব্যর্থ-অসফল ভাবতে শুরু করেছিল সে। সেই কারণেই এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত।

    দময়ন্তীর বাবার কথায়, ‘সামনে মাধ্যমিক। খেলতে গিয়ে স্কুলে উপস্থিতির হার কম থাকায় উৎকণ্ঠায় ভুগছিল মেয়ে। তার উপর প্রিয় খেলা ছাড়তেও চায় না। আট-নয় ঘণ্টা প্র্যাকটিসের পরে মাধ্যমিকের পড়ার চাপও তো অনেকটা। ও হয়তো ব্যালান্স করতে পারেনি।’ জাতীয় স্তরে শুটিংয়ে পদকজয়ী দময়ন্তী এই ছোট বয়সে সব কিছু একসঙ্গে ব্যালান্স করতে পারছে না বলে মনে করেছিল। সেই উৎকণ্ঠা থেকেই বাবা-মায়ের কাছেও নিজের মনের কথা না বলতে পেরেই বাড়ি ছাড়েন বলে মত তাঁর বাবার। তবে এ বিষয়ে তিনি দময়ন্তীর সঙ্গে পরে বিস্তারিত কথা বলবেন বলেও জানান ধ্রুবজ্যোতি। তবে ৪৮ ঘণ্টা পরে বাড়ি ফিরে এখন হাসিখুশিই আছে বলে জানিয়েছেন দময়ন্তীর বাবা।

    ​গত বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ি থেকে দুধ ও কিছু ঘরের জিনিস কিনতে বের হয়েছিল দময়ন্তী। সাথে কোনও মোবাইল ফোন ছিল না। এর পরে আর সে বাড়ি ফিরে আসেনি।​স্টেশনের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজে দেখা যায়, সে হাওড়া স্টেশনের ৪ ও ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে যাচ্ছে। পরে জানা যায়, সেখান থেকে সে লোকাল ট্রেন ধরে হুগলির শ্রীরামপুরে মহেশের রথযাত্রায় যায় এবং রথের দড়িও টানে। ফোন বাড়িতে রেখে যাওয়ায় পুলিশের পক্ষে তার লোকেশন ট্র্যাক করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

    পুলিশ প্রশাসন ও পরিবারের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, দময়ন্তী হাওড়া থেকে শ্রীরামপুর হয়ে বিভিন্ন জেলায় ঘুরেছিল। আধ্যাত্মিকতার প্রতি তার গভীর আগ্রহ থাকায় সে কিছুটা আনমনা হয়েই বিভিন্ন জায়গায় চলে যান বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সে নিজেই আবার হাওড়ায় ফিরে আসার চেষ্টা করছিল এবং শনিবার ভোরে রামকৃষ্ণপুর ঘাটে এসে পৌঁছয়। সেখান থেকেই তার বাবা পরিবার তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যান। এই ঘটনার পিছনে কোনও রকম অপরাধমূলক যোগের প্রমাণ মেলেনি।

    ​অলিম্পিয়ান ও দময়ন্তীর প্রশিক্ষক জয়দীপ কর্মকার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে জানান যে, দময়ন্তী সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক রয়েছে। তাঁর মা মৌমিতা রায় সেনও একটি আবেগঘন পোস্টে পুলিশ, প্রশাসন, রাজ্য সরকার ও সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্ত শুভানুধ্যায়ীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। জাতীয় দলের ট্রায়ালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এই উঠতি শুটারের ঘরে ফেরায় স্বস্তিতে গোটা বাংলার ক্রীড়ামহল।

  • Link to this news (এই সময়)