• যাদবদার ফ্রি ট্রেনিং নিয়ে সেনা বাহিনীতে যোগদান তরুণদের
    এই সময় | ১৮ জুলাই ২০২৬
  • নীলাঞ্জন দাস, রায়গঞ্জ

    রোজ সকাল ও বিকেলে রায়গঞ্জের কুলিক বনাঞ্চলের 'মিলিটারি বাগান'-এ গেলেই চোখে পড়ে এক অন্যরকম দৃশ্য। একদল তরুণ-তরুণীর কেউ দৌড়চ্ছেন, কেউ হাইজাম্প বা লংজাম্পের অনুশীলনে ব্যস্ত। কেউ আবার স্ট্রেচিং করছেন। তাঁদের অনুশীলনের তদারকিতে থাকেন এক ট্রেনার। কখনও নির্দেশ দিচ্ছেন, কখনও ভুল ধরিয়ে দিচ্ছেন, প্রয়োজনে ধমকও দিচ্ছেন। তিনি সঞ্জীব যাদব, যিনি সকলের কাছে বেশি পরিচিত 'যাদবদা' নামে।

    রায়গঞ্জ পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তুলসিতলার খরমুজা ঘাট রোড এলাকার বাসিন্দা সঞ্জীবের বয়স ৪৬ বছর। স্ত্রী ও দুই কলেজপড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে তাঁর সংসার। বাবার আমল থেকেই পরিবারের দুধের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। ছোটবেলা থেকে বাড়ি-বাড়ি দুধ পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে আসছেন। এক সময়ে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, কিন্তু সেই সাধ পূরণ হয়নি। অন্য একটি সাধ পূরণ হয়েছে, তিনি হয়ে উঠেছেন অ্যাথলেটিক্স কোচ।

    প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি কুলিক ফরেস্টে সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে ছেলে-মেয়েদের দৌড়, হাইজাম্প, লংজাম্প-সহ বিভিন্ন শারীরিক কসরতের প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছেন 'যাদবদা'। তাঁর দাবি, এখনও পর্যন্ত পাঁচ থেকে সাত হাজার ছেলে-মেয়েকে তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এঁদের মধ্যে প্রায় তিন হাজার তরুণ-তরুণী সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীতে চাকরি পেয়েছেন। কিন্তু সঞ্জীব এখনও কঠিন বাস্তবের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন।

    শুধু দুধের ব্যবসা করে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল সঞ্জীবের। ২০১২-তে রায়গঞ্জ পুরসভার নাইট গার্ড হিসেবে কাজে যোগ দেন। এখন তাঁর মাসিক বেতন ৬ হাজার ২০০ টাকা। তবে গত পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। এর পাশাপাশি তিন বছর ধরে কালিয়াগঞ্জের তরঙ্গপুর গার্লস হাইস্কুলে সামান্য সাম্মানিকের বিনিময়ে ছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেন। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ছেলে-মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। রোজ নিয়ম করে সাইকেল চালিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন কুলিকের 'মিলিটারি বাগান'-এ।

    এ ভাবেই নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে সঞ্জীব পূরণ করেছেন অন্যের সাফল্যের মধ্যে দিয়ে। আড়াই দশক ধরে বিনা পারিশ্রমিকে অসংখ্য তরুণ-তরুণীর প্রতিরক্ষা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্নপূরণে যে ভূমিকা তিনি পালন করে চলেছেন, তা নিঃসন্দেহে রায়গঞ্জে এক অনন্য নজির। 'যাদবদা'র কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া রায়গঞ্জের সুভাষগঞ্জের বাসিন্দা মিজানুর রহমান এখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মী। বলেন, 'স্যারের কাছে আমি ২০১৩ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্র্যাকটিস করেছি। ২০১৯-এই আমি আর্মিতে চান্স পাই। আমার আগের ও পরের ব্যাচের আরও অনেকে ডিফেন্সে চান্স পেয়েছে।' একই অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন রায়গঞ্জের খরমুজাঘাট এলাকার বাসিন্দা ও বিএসএফ কর্মী বিপ্লব যাদব। তিনি বলেন, 'আমি ২০১৭থেকে ২০২০ পর্যন্ত স্যারের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে সে বছর বিএসএফে যোগ দিয়েছি।'

    মাধ্যমে মিজানুর-বিপ্লবদের সঞ্জীবের ইচ্ছেপূরণ হয়েছে কিছুটা। যাদব বলেন, 'সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তা পূরণ হয়নি, তবে কোচ হওয়ার ইচ্ছেটা পূরণ করতে পেরেছি। ২৫ বছর ধরে এই ফরেস্টে একদম ফ্রি-তে ছেলে-মেয়েদের দৌড়, হাইজাম্প, লংজাম্প প্র্যাকটিস করাচ্ছি। অনেত ছেলে-মেয়ে ডিফেন্সে চাকরি পেয়েছে। এটা আমার একটা নেশার মতো, তাই যত দিন পারব এ ভাবেই প্রশিক্ষণ দিয়ে যাব।'

  • Link to this news (এই সময়)