টানা ২১ দিনের অনশনে হাত-পায়ের জোর হারালেও মনের জোর হারাননি শিক্ষাবিদ-সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। চিকিৎসকদের সাবধানবাণী সত্ত্বেও অনশন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এই সমাজকর্মী। কিন্তু শনিবার সকালে তাঁর শারীরিক অবস্থার চূড়ান্ত অবনতি ঘটেছে দাবি করে ওয়াংচুককে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এই পদক্ষেপে অসন্তুষ্ট সোনমের স্ত্রী গীতাঞ্জলি মো আংমো। তাঁর দাবি, ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও হাসপাতালে ভর্তি করানোর মতো পরিস্থিতি মোটেও হয়নি।
টানা ২১ দিনের অনশনে সাংঘাতিক দুর্বল ৫৯ বছর বয়সি সোনম ওয়াংচু। হাসপাতালে ভর্তির পরে তাঁকে সফদরজং হাসপাতালের চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, দীর্ঘ অনশনের কারণে সোনম ওয়াংচুকের মৃদু ডিহাইড্রেশন হয়েছে এবং তিনি খুবই দুর্বল। তাঁর ব্লাড প্রেসার ও সুগার লেভেল স্বাভাবিকের থেকে কম রয়েছে। শনিবার সকালে এই খবর জানান দিল্লির সফদরজং হাসপাতালের মেডিক্যাল সুপার চারু বাম্বা। তবে, তিনি একই সঙ্গে জানিয়েছে, দুর্বল হলেও সোনমের অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি পুরোপুরি সচেতন রয়েছেন।
চিকিৎসক বাম্বা আরও জানান, এ দিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সোনম ওয়াংচকে সফদরজং হাসপাতালে আনা হয়। তার পর থেকে চিকিৎসকরা তাঁকে সর্বক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন। ওয়াংচুকের শরীরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ স্থিতিশীল রয়েছে। তাঁকে প্রথমে হাসপাতালের জরুরি মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করানো হয়েছিল। পরে তাঁকে মেডিসিন বিভাগে রেফার করা হয়। সোনমকে টানা পর্যবেক্ষণে রাখা হবে এবং তাঁর যে সামান্য পরিমাণ ডিহাইড্রেশন রয়েছে, তা ঠিক করতে চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ করা হবে। সূত্রের খবর, হাসপাতালের দুই চিকিৎসক এবং দুই প্যারামেডিক সোনম ওয়াংচুককে পর্যবেক্ষণ করছেন।
হাসপাতালের রিপোর্টে সন্তুষ্ট নন ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি মো আংমো। তিনি বলেন, ‘এখন কোনও চিকিৎসা চলছে না। কেবল পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। অথচ তারা আমাদের অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনও রিপোর্ট দেখাচ্ছে না।’ এখানেই শেষ নয়, তাঁর স্ত্রীর দাবি, ‘পটাশিয়ামের মাত্রা ২.৯-এ পৌঁছানোর মতো যে পরিসংখ্যান হাসপাতাল মেডিক্যাল বুলেটিনে উল্লেখ করছে, তা অবিশ্বাস্য। কারণ, গতকাল তা ছিল ৪.৩। আজ এতটা পরিবর্তন হতে পারে না। কোনও ওষুধ দেওয়ার আগে আমরা অন্য একটি ল্যাবে রিপোর্টগুলি যাচাই করে নিতে চাই।’
একইসঙ্গে অনশনরত ওয়াংচুককে হাসপাতালে ভর্তির পদক্ষেপেরও সমালোচনা করেন গীতাঞ্জলি। সোনমকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া নিয়ে দিল্লি পুলিশ জানায়, সোনম ওয়াংচুকের দ্রুত স্বাস্থ্যের অবনতির কথা বিবেচনা করে, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দিল্লির ডিসিপি (DCP) শচীন শর্মা জানান, দীর্ঘ ২১ দিনের অনশনে ওয়াংচুকের ৯.৫ কেজি ওজন কমে গিয়েছে (যা ওঁর শরীরের মোট ওজনের প্রায় ২০%)। এ ছাড়া শরীরে জলের চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। তাই আদালতের নির্দেশ মেনে ওঁর জীবন বাঁচাতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
এরই পাল্টা ওয়াংচুকের স্ত্রীয়ের দাবি, ‘হাইকোর্টের আদেশের বিষয়ে বলতে গেলে, সেই আদেশে হাসপাতালে ভর্তি করানো বাধ্যতামূলক বলা হয়নি। এতে কেবল বলা হয়েছে যে, ব্যক্তির স্বাস্থ্যই সর্বাগ্রে এবং তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে; হাসপাতালে ভর্তির কোনও আদেশ দেওয়া হয়নি। সুতরাং, একে হাইকোর্টের আদেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’
এ ছাড়া ওয়াংচুককে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তির পরে গীতাঞ্জলি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘গতকাল (শুক্রবার) ও (সোনম) ভালোই ছিল। তাঁকে হাসপাতালে আনার কোনও প্রয়োজন ছিল না। সংবিধানের ৩২ নং ধারা অনুযায়ী এটা আমার অধিকার। আমার এবং আমার চিকিৎসকের সম্মতি ছাড়া ওঁকে মুখে বা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে (Intravenous) কোনও কিছু দেওয়া যাবে না। আমার অনুমতি ছাড়া কোনও চিকিৎসা যেন শুরু না করা হয়। ওঁর কিছু হলে আমি সবাইকে দায়ী করব।’
তবে দিল্লি পুলিশ নিজেদের দাবিতে অনড়। তাদের দাবি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শে এবং দিল্লি হাইকোর্টের আদেশ মেনে ওয়াংচুককে ‘অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসার’ জন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। সোনমকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরে সফদরজং হাসপাতালের বাইরে মোতায়েন প্রচুর পুলিশ বাহিনী।