Mystery Death 3 Same Family: জলপাইগুড়ির বানারহাট ব্লকের পূর্বদুরামারি এলাকায় একই পরিবারের তিন সদস্যের পরপর মৃত্যুতে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের টানাপোড়েন নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো জটিল রহস্য তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বানারহাট থানার পুলিশ। মোরাঘাট জঙ্গল থেকে প্রথমে স্ত্রী ও পরে স্বামীর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর এবার খোদ বৌদির চিতাস্থলেই গিয়ে আত্মহত্যা করলেন দেওর। এই নির্মম ও নজিরবিহীন ঘটনার জেরে পূর্বদুরামারি গ্রাম জুড়ে এখন গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে নিজের বাবা, মা এবং কাকাকে হারিয়ে সম্পূর্ণ অনাথ হয়ে পড়েছে দম্পতির ১৪ বছরের নাবালক ছেলেটি।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত বুধবার। পূর্বদুরামারির বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী চুমকি রায়ের রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয় মোরাঘাট জঙ্গলের এসএমজি-৩ কম্পার্টমেন্ট এলাকা থেকে। মাকে খুনের খবর পেয়েই মৃতার ১৪ বছরের নাবালক ছেলে পুলিশের দ্বারস্থ হয়। সে পুলিশকে জানায় যে তার বাবা বিমল রায় তাকে মোবাইলে একটি হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। সেই বার্তায় ৪৪ বছর বয়সী বিমল রায় স্বীকার করেন যে তিনি নিজেই তাঁর স্ত্রীকে খুন করেছেন এবং এর অপরাধবোধ থেকে তিনি নিজেও আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন। এই ঘটনার জন্য পরিবারের অন্য কেউ দায়ী নন বলেও সেই ভয়েস মেসেজে জানান বিমল।
এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ ও বনদফতর বুধবার রাতে মোরাঘাট জঙ্গলে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। তবে গভীর রাত পর্যন্ত খোঁজ না মেলায় পরের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার ঠিক দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৫০ ফুট দূরে একটি গাছে বিমল রায়ের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বামী-স্ত্রীর এই জোড়া মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই শুক্রবার এক চরম মর্মান্তিক কাণ্ড ঘটে যায়। রাঙাতি মহাশ্মশানে যেখানে চুমকি রায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল সেই শ্মশানের চিতাস্থলের কাছে একটি গাছে গিয়ে আত্মহত্যা করেন চুমকির ৩৭ বছর বয়সী দেওর সনাতন রায়। স্থানীয় গ্রামবাসীরা শ্মশানে দেহটি ঝুলতে দেখে পুলিশে খবর দেন।
তদন্তে নেমে পুলিশ সনাতন রায়ের মোবাইল ট্র্যাক করে আরও এক বিস্ফোরক তথ্য হাতে পেয়েছে। জানা গিয়েছে যে আত্মহত্যার ঠিক আগে সনাতন তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে বৌদি চুমকি রায়ের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একাধিক ছবি পোস্ট করেছিলেন। তারপরই তিনি শ্মশানে গিয়ে আত্মঘাতী হন। ঘটনার তদন্তের স্বার্থে পুলিশ সনাতনের মোবাইল ফোনটি বাজেয়াপ্ত করেছে এবং সেখান থেকে ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। প্রাথমিক অনুমান যে এই ত্রিকোণ প্রেমের সম্পর্কের জটিলতাই ডেকে এনেছে এমন ভয়ংকর পরিণতি।
মৃত বিমল ও সনাতনের মা শোভারানি রায় পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন যে তাঁর দুই ছেলের মৃত্যুর জন্য তাঁর বৌমা চুমকিই দায়ী। মেজো ছেলে বিমল বাইরে কাজে চলে গেলে সনাতনের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত চুমকি। এই নিয়ে একাধিক বার গ্রামে সালিশি সভা হয়েছে কিন্তু তারপরেও তা বন্ধ হয়নি। মৃতদের পরিবারের আরেক সদস্য রিতা রায় জানান যে বিগত নয় বছর ধরে দেওর-বৌদির এই সম্পর্ক ছিল যা তাঁরা কোনোভাবেই মানতে পারেননি। এই নিয়ে বাড়িতে দুই ভাইয়ের মধ্যে মারপিট পর্যন্ত হয়েছে এবং গ্রামে সালিশি সভাও বসেছে। বিজেপি দলের স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য রতন সরকারও জানান যে দেওর-বৌদির মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে অনেক বার সালিশি সভা হয়। তাঁর অনুমান যে বৌদি ও দাদা দুজনেই চলে যাওয়ায় মানসিক অবসাদ থেকে শ্মশানের মধ্যে গাছে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন সনাতন।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে যে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে তদন্ত প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে এবং কোনো সম্ভাবনাকেই উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না। চুমকিকে কি তাঁর স্বামী খুন করেছিলেন নাকি এই ঘটনার আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো অজানা সত্য তা জানার চেষ্টা চলছে। বিমলের মৃত্যু কি আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু এবং বৌদির মৃত্যুতে সনাতন কি মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন নাকি তাঁর মৃত্যুর সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে অন্য রহস্য তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।