শব্দ ব্রহ্ম! ব্রহ্মাণ্ডের খোঁজ দেবে দেশের প্রথম ‘শব্দ জাদুঘর’, গড়ে উঠছে কলকাতায়
প্রতিদিন | ১৮ জুলাই ২০২৬
শব্দই ব্রহ্ম! আর সেই শব্দের ব্রহ্মাণ্ডের খোঁজ। একটি শব্দ আজ যেমন শোনায়, হাজার বা দুই হাজার বছর আগে তার উচ্চারণ কেমন ছিল? কীভাবে বদলেছে শব্দের রূপ, অর্থ, ধ্বনি? সেই ইতিহাস এবার চোখে দেখা ও কানে শোনার সুযোগ মিলবে। হ্যাঁ, শব্দের জাদুঘর। দেশের প্রথম শব্দ জাদুঘর কলকাতায়। ভারতীয় ভাষার দীর্ঘ বিবর্তনে এই জাদুঘর গড়ে উঠছে কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারের একটি ভবনে। আগামিকাল, রবিবার তার উদ্বোধন করবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
মোট ৯টি গ্যালারি নিয়ে তৈরি হচ্ছে এই শব্দের জাদুঘর। সেগুলি হল- ১) আদি শব্দ, ২) মাতৃভাষা, ৩) নব-রস, ৪) ভাষার বিবর্তন, ৫) প্রতিটি ভাষায় মহাপুরুষদের অবদান, ৬) মৌখিক ঐতিহ্য, ৭) প্রদর্শন (পারফর্মিং), ৮) সর্বজনীন সংলাপ, ৯) পাবলিক লাইব্রেরির ইতিহাস। প্রতিটি গ্যালারি সেজে উঠেছে নানা ছবি, কারুকার্য, বিভিন্ন আদি ভাষার (ব্রাহ্মী, পালি ইত্যাদি) লিপি দিয়ে। প্রদর্শন গ্যালারিতে যেমন স্থান পেয়েছে পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ, উত্তরবঙ্গের গম্ভীরার মুখোশ। এমনকী, আদিবাসীদের আর্টও। এই জাদুঘরে ভারতের সংবিধান প্রদর্শন গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে পুরুলিয়ার ছৌ মুখোশ।
স্বীকৃত ২২টি ভাষার শব্দভাণ্ডার, ধ্বনির বিবর্তন এবং ভাষার ইতিহাসকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। অডিও-ভিজুয়াল প্রদর্শনী, ডিজিটাল ডিসপ্লে, ইন্টারঅ্যাকটিভইনস্টলেশন এবং বিভিন্ন ভাষার প্রাচীন ও আধুনিক উচ্চারণের তুলনামূলক উপস্থাপনা দর্শকদের সামনে ভাষার এক নতুন জগৎ। জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ হল, একটি নির্দিষ্ট শব্দের শতাব্দীজুড়ে বিবর্তনের ধারাকে অনুসরণ করা যাবে। কোনও শব্দ হাজার বা ২০০০ বছর আগে কীভাবে উচ্চারিত হত, তার অর্থ কী ছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে তার পরিবর্তন ঘটেছে, তার তথ্য ও নমুনা এখানে পাওয়া যাবে। ভাষাবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ দর্শকদের কাছে এটি এক ‘অমূল্য’ ভাণ্ডার।
জাতীয় গ্রন্থাগারের আধিকারিকরা জানান, ভারতের ভাষাগত বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের লক্ষ্যে এই মিউজিয়াম। দেশের বিভিন্ন ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং ভাষার ক্রমবিকাশ সম্পর্কেও এখানে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রদর্শনীতে দর্শকরা শুধু তথ্য পড়বেন না, বরং শুনতে এবং দেখতে পারবেন ভাষার বিবর্তনের যাত্রাপথ। ভারতে মোট ভাষার সংখ্যা ১২১। বহু আদি ভাষা বিলুপ্তির পথে। শব্দের জাদুঘরের এটি প্রথম পর্যায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে থাকবে ভারতীয় অন্যান্য ভাষাগুলির ইতিবৃত্ত।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম এই ধরনের একটি শব্দ জাদুঘর গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। ২০২১ থেকে তার কাজ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর সেই ভাবনার বাংলায় বাস্তব রূপ পেল এবছর, ২০২৬ সালে। রবিবার উদ্বোধন করবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। উপস্থিত থাকবেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জাতীয় গ্রন্থাগারের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘শব্দ জাদুঘরের পরবর্তীতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায় হবে। সেখানে গুরুত্ব পাবে আদিবাসী ভাষাগুলি। তার কাজও চলছে।” শব্দ, ধ্বনি, ভাষা – এই তিন নিয়েই আমাদের পথ চলা। তার ইতিহাস অনুসন্ধান জরুরিও। এই জাদুঘর তার মুখোমুখি হওয়ার স্বপ্ন সার্থক করল বইকী!