এই সময়: দেশে প্রথমবার পেঁচার বাস্তুতন্ত্র ও বর্তমানে তাদের জীবনধারণ পরিস্থিতি জানতে রাজ্যব্যাপী সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এর আগে একাধিক রাজ্যে শিকারী পাখিদের (র্যাপটার) সমীক্ষা চলেছে। তবে আলাদা করে পেঁচাকে নিয়ে সমীক্ষা প্রথম শুরু হলো বাংলাতেই। রাজ্য বন দপ্তরের অনুমতি নিয়ে ডব্লিউডব্লিউএফ-এর সহযোগিতায় বছরব্যাপী এই সমীক্ষার কাজটি হাতেকলমে করছেন বার্ডওয়াচার সোসাইটির সদস্যরা। গত জানুয়ারিতে শুরু হওয়া সমীক্ষা শেষ হবে ডিসেম্বরে। শনিবার নিউ টাউনে বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সেই সমীক্ষার অভিনবত্বই উঠে এল বিশেষজ্ঞদের মুখে। একই সঙ্গে জানা গেল, দ্রুত নগরায়ণ ও চাষের কাজে কীটনাশকের ব্যবহারে কী ভাবে চরম সঙ্কটের মুখে পড়ছে পেঁচা।
সাধারণ মানুষের সাহায্য ছাড়া যে কোনও প্রাণীরই সংরক্ষণ সম্ভব নয়, এ দিন তা বার বার মনে করান বাংলার প্রধান মুখ্য বনপাল রাজেশ কুমার। তাঁর কথায়, ‘রাজ্যের কোথায় কত পাখি আছে, তার কতটুকুই বা আমরা জানি। শুধু তো সংরক্ষিত অরণ্যে পাখি থাকে এমন নয়, মানুষের কাছাকাছি বহু পাখির বাস। মানুষের সাহায্য ছাড়া তাদের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব নয়।’
ভারতে ডব্লিউডব্লিউএফ-এর সিইও রবি কুমার ছোটবেলার স্মৃতি থেকে বলেন, ‘সত্তরের দশকে সল্টলেকে কত পাখি ছিল। কিন্তু সংরক্ষণের এমন কোনও মডেল আমাদের হাতে এখনও নেই, যেখানে দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে ওদের বাঁচানোর একটা ভারসাম্যের জায়গা থাকে। পাখির বেআইনি ব্যবসা আগেও সমস্যা ছিল। ক্রমশ আর্থসামাজিক উন্নয়নে শহর বেড়েছে, ঘাসের জমি কমেছে, পুরোনো গাছ কাটা পড়েছে সর্বত্র। ফলে পেঁচা মোটা গাছের কাণ্ডে গর্ত বা কুঠুরি বানিয়ে বাসা বাঁধার জায়গা পায় না। চাষের কাজে কীটনাশকের ব্যবহারও কমাতে পারিনি আমরা। চাষের জমির আশপাশে কীটনাশক খেয়ে ইঁদুর মারা পড়ে। আর পেঁচারা অজান্তে সেই মরা ইঁদুরের মাংস খেয়ে মারা যায়।’
এই পরিস্থিতিতে জানা প্রয়োজন ছিল, যে বাংলার সাহিত্য থেকে সংস্কারে পেঁচা ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে, সেখানে তাদের থাকার জায়গা আসলে কতটা। বার্ডওয়াচার সোসাইটির পক্ষে সুজন চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘আমরা আপাতত র্যান্ডম সার্ভে করছি। মানে যেখানে আগে থেকেই পেঁচার খোঁজ মিলেছে, সেই জায়গা নয়। বাংলার প্রায় সব জেলা থেকে শহুরে ও গ্রাম্য মিলিয়ে ১০০টি এমন এলাকা বাছা হয়েছে সমীক্ষার জন্য, যেখানে কখনও কোনও সমীক্ষা হয়নি। আমাদের গবেষকরা সন্ধে থেকে ভোর পর্যন্ত নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সেইসব এলাকায় কোন কোন পেঁচা পাওয়া যায়, তাদের চ্যালেঞ্জ কী, শিকারযোগ্য কোন প্রাণী আছে -- এই সব তথ্যই সংগ্রহ করছেন।’
এখনও পর্যন্ত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল -- এই চার মাসে অন্তত ১২টি জেলায় সমীক্ষার কাজে ১১ প্রজাতির পেঁচার দেখা মিলেছে। অগস্ট থেকে সমীক্ষার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে গবেষকদের বিশেষ নজর থাকবে সুন্দরবনে। তবে পেঁচার সংখ্যা গোনা (শুমারি) উদ্দেশ্য নয়, উদ্যোক্তারা চান বঙ্গে পেঁচার বাস্তুতন্ত্রের বাস্তব ছবিটা সামনে আনতে। তা থেকে গোটা দেশের জন্যই সংরক্ষণ মডেল তৈরি করা যেতে পারে।