• ভিড় সামলাতে উদ্যোগ, কঠোর নিরাপত্তাও, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে ঢালাও ব্যবস্থা শ্রাবণী মেলায়
    এই সময় | ১৯ জুলাই ২০২৬
  • এই সময়, চন্দননগর: তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলা সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশিকার পরেই যানবাহনের বিধিনিষেধ নিয়ে বাড়তি তৎপরতা শুরু হয়েছে জেলা প্রশাসনের অন্দরে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় ‘নো এন্টি’ বা যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হলেও, বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা করেছে জেলা পুলিশ ও প্রশাসন।যেখান দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স, দুধ ও জরুরি পরিষেবার পণ্যর গাড়ি অনায়াসে যেতে পারবে। শনিবার হরিপাল বিডিও অফিসে উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক বৈঠক হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা শ্রীরামপুরের বিধায়ক ভাস্কর ভট্টাচার্য, জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি, গ্রামীণ পুলিশ সুপার(হুগলি) কুনওয়ার ভূষণ সিংহ ও পুলিশ কমিশনার সুনীল যাদব।

    বৈঠক সূত্রে জানা গিয়েছে, মেলাকে কেন্দ্র করে মন্ত্রী, বিধায়ক, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্তারা তারকেশ্বর থেকে বৈদ্যবাটি পর্যন্ত শ্রাবণী মেলার এলাকা পরিদর্শন করার পরে কোথায় কী সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন। এ বার শ্রাবণী মেলায় এক কোটি পুণ্যার্থীর সমাগমের লক্ষ্য ধরে নিয়ে জলযাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয় প্রশাসনিক বৈঠকে। গঙ্গার ঘাটে স্নানের জন্য ১৪টি ঘাটে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতি ৫ কিমি অন্তর স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়েছে শেওড়াফুলি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত। ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা পরিষেবা, সব রকম ওষুধ মজুত রাখা হবে। মণিকমল হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা হয়েছে, অসুস্থ হলে দ্রুত পাঠানো হবে। রয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা। গঙ্গায় কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে, সঙ্গে সঙ্গে ওয়াটার অ্যাম্বুল্যান্সে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু নিয়েও প্রশাসনিক বৈঠকে আলোচনা হয়। রাস্তার প্রতিটি মোড়ে মোড়ে কড়া পুলিশি ব্যবস্থা ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে। প্রত্যেক পুণ্যার্থীকে গাইড ম্যাপ দেওয়া হবে। তাতে লেখা থাকবে কোথায় পানীয় জল, শৌচালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র। শনি, রবি ও সোমবার সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। তাই এই দিনগুলিতে থাকছে বিশেষ ব্যবস্থা। ছোট গলির আনাজ বিক্রেতাদের সকাল ৯টা পর্যন্ত বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। নিমাইতীর্থ ঘাট থেকে জল তুলে নিয়ে লাখো লাখো ভক্ত তারকেশ্বর মন্দির প্রায় ৩৭ কিমি রাস্তা পায়ে হেঁটে যাবেন। সেখানে বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালবেন তাঁরা। যাত্রাপথের সমস্যা মেটাতে গোটা রাস্তা আলো দিয়ে সাজাবে পঞ্চায়েতগুলি। এ ছাড়া, জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের উদ্যোগে তৈরি করা হবে জলসত্র। ঠান্ডা গরম দু’রকম জলেরই ব্যবস্থা থাকবে।

    যদিও শ্রাবণী মেলার আগেই বৈদ্যবাটি–তারকেশ্বর রোড সংস্কার করেছে রাজ্যের পূর্ত দপ্তর। শ্রাবণী মেলার যাত্রাপথ পরিচ্ছন্ন রাখতে বৈদ্যবাটি থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত ১৫০ মিটার অন্তর প্রায় শতাধিক অস্থায়ী ডাস্টবিন বসানো হবে। বৈদ্যবাটি থেকে তারকেশ্বর যাওয়ার পথে বৈদ্যবাটি, কামারকুন্ডু রেল গেটগুলিতে দুর্ঘটনা ঠেকাতে পুলিশ ও জিআরপি বেশি মাত্রায় মোতায়েন করা হবে।এ ছাড়া, ওয়াচ টাওয়ার থেকে নজরদারি চালাবে হুগলি গ্রামীণ ও কমিশনারেটের পুলিশ। শ্রাবণী মেলায় যাতায়াত ব্যবস্থায় গতি আনতে ইতিমধ্যেই বাড়টি ট্রেন চালানোর কথা ঘোষণা করেছে পূর্ব রেল। তবে জলযাত্রীদের সুবিধার জন্য পুলিশ প্রশাসন থেকে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের নির্দেশিকা জারি হয়েছে।

    পুলিশ প্রশাসন সূত্রে খবর, জুলাই ও আগস্ট মাসজুড়ে শ্রাবণী মেলাকে প্রশাসনিক ভাবে শনি ও রবিবারকে গুরুত্বপূর্ণ ধরে নিয়ে ছ’টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্ব শুরু হয়েছে ১৪ থেকে ২০ জুলাই। দ্বিতীয় পর্বে ২৪ থেকে ২৭ জুলাই। তৃতীয় পর্বে ৩১ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট, চতুর্থ পর্বে ৭ আগস্ট থেকে ১০ আগস্ট, পঞ্চম পর্বে ১৪ থেকে ১৭ আগস্ট, ষষ্ঠ পর্বে ২২ থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত শ্বেতপুর মোড়, দিল্লি রোড, দীর্ঘাঙ্গী মোড় থেকে তারকেশ্বরের দিকে ১২ নম্বর রুট, ভদ্রেশ্বরের বিঘাটি মোড়, পিয়ারাপুর, চাঁপসরা, বৈদ্যবাটি–তারকেশ্বর রোড, চন্দননগর হাসপাতাল মোড় থেকে বৈদ্যবাটি চৌমাথায় যান নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এ ছাড়া ডালহৌসি জুটমিল, মঞ্জুশ্রী, রিষড়া মৈত্রীপথ, বাঘখাল পর্যন্ত নো এন্ট্রি থাকবে। চন্দননগর ও ভদ্রেশ্বর থানা সীমানার মধ্যে মঞ্জুশ্রী মোড় থেকে বৈদ্যবাটি চৌমাথা হয়ে জিটি রোড, শ্রীরামপুর ও রিষড়া থানা সীমানার মধ্যে জোড়া অশ্বত্থতলা থেকে বাঘখাল, উত্তরপাড়া থানা সীমানায় বালিখাল থেকে বাঘখাল পর্যন্ত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা হবে। মূলত অটো, টোটো, ই–রিকশ, ইঞ্জিন ভ্যান নিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে চন্দননগর ও ভদ্রেশ্বর থানা এলাকায় বিকল্প রাস্তা হিসেবে পালপাড়া রোড, বিঘাটি মোড়, দিল্লি রোড হয়ে দর্জি মোড় দিয়ে যাতায়াত করা যাবে। শ্রীরামপুর ও রিষড়া থানা এলাকার মধ্যে অমূল্যকানন, প্রভাসনগর, শ্রীরামপুর বটতলা মোড়, জিতেন লাহিড়ী রোড ও ৪ নম্বর রেল গেটের রাস্তার কথা বলা হয়েছে।উত্তরপাড়া থানা এলাকার বিকল্প রাস্তা হিসেবে বিশালাক্ষ্মী মোড়, রেললাইন ধার, সুধীর ঘাট ও ধারসা মোড়ের কথা বলা হয়েছে।

    এ দিন বৈঠকের পরে মন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্য বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশিকা মেনেই প্রশাসনের তরফে শ্রাবণী মেলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এ বার শ্রাবণী মেলাকে বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, যেটা রাজ্যবাসীর কাছে খুবই গর্বের। রাজ্যে আমাদের সরকার আসার পরে শ্রাবণী মেলা আলাদা একটি মাত্রা পেয়েছে।’

    কলকাতা থেকে প্রায় ৫৬ কিমি দূরে তারকেশ্বর। হাওড়া থেকে ট্রেনে চেপে তারকেশ্বর স্টেশন আসতে সময় লাগে মাত্র ঘণ্টা দেড়েক।স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে কিছুটা এগোলেই তারকেশ্বরের মন্দির। প্রসিদ্ধ শৈবতীর্থে বাংলার আটচালা স্থাপত্যের ঐতিহ্য বহন করছে তারকেশ্বর মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহে স্বয়ং বিরাজ করছেন বাবা তারকনাথ। মন্দিরের পশ্চিম দিকে আছে শিবগঙ্গা, যা দুধ পুকুর নামে পরিচিত। পূর্ব দিকে কালীমাতার মন্দির ও দক্ষিণ দিকে মোহন্ত মহারাজের প্রাসাদ। শ্রাবণ বাবা তারকনাথের জন্মমাস। এই মাসে বাবা তারকনাথকে জলাভিষেক করলে ভক্তের মঙ্গলসাধন ও মনোবাসনা পূর্ণ হয় বলে বিশ্বাস। তাই লাখো লাখো ভক্ত বৈদ্যবাটির নিমাইতীর্থ ঘাট থেকে গঙ্গার জল তুলে এনে বাবার মাথায় ঢালেন।

  • Link to this news (এই সময়)