• জার্মান–জেদ আর ডাচ–টাচই মেসিদের কামব্যাক কেমিস্ট্রি
    এই সময় | ১৯ জুলাই ২০২৬
  • পার্থ দত্ত

    বাংলায় একটা কথা আছে ‘জলবৎ তরলং।’ এ বার বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার প্লেয়িং স্টাইলের নামও অনেকটা এ রকম। ফ্লুইড ফুটবল।

    একটা পাত্রে জল রেখে পাত্রকে যে দিকেই হেলান না কেন, জলটা সমানভাবে সে দিকে ধাবিত হয়। চলতি বিশ্বকাপের চারটি নক আউট ম্যাচে (বিশেষ করে দ্বিতীয়ার্ধে) লিওনেল মেসির টিম যেন ঠিক এ রকমই অ্যাটাক করছে। প্রতিপক্ষের বক্সের ডান দিক দিয়ে ঝড় তুলতে তুলতেই অ্যাটাকটা ধাবিত হচ্ছে বাঁ দিকে। আবার কখনও ডাউন দ্য মিডল অ্যাটাকটা পরিণত হচ্ছে প্রান্তিক ঝড়ে। ব্যাপারটা যেন ‘জলবৎ তরলং।’

    এমন ফুটবলের জন্য আর্জেন্তিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির কেমিস্ট্রি কী? নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি কোচ রেনে মিশেলের টোটাল ফুটবলের ছোঁয়া রয়েছে স্কালোনির স্ট্র্যাটেজিতে। টোটাল ফুটবলের মূল ভিত্তিটাই ছিল, কোনও ফুটবলারের নিজস্ব পজিশন থাকবে না। সবাই পজিশন বদলাবেন প্রয়োজন মতো। আর্জেন্তিনার মাঝমাঠের দিকে নজর রাখলে দেখবেন, এন্‌সো ফার্নান্দেস, ম্যাক অ্যালিস্টার, পারেদেস, রদ্রিগো দে পলরা ক্রমাগত নিজেদের মধ্যে শাফল করছেন। এতটাই দ্রুত জায়গা বদলাচ্ছেন যে, প্রতিপক্ষ রীতিমতো বিভ্রান্ত। এর সঙ্গে আছেন পেসেন্স বিল্ড আপ। অর্থাৎ কিনা ধৈর্য ধরে অ্যাটাককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও ধরে রাখা। প্রায় প্রতি ম্যাচেই এখনও পর্যন্ত আর্জেন্তিনার বল পজেশন ৫৮–৩৪ শতাংশ। নির্ভুল পাসিং ৯০ শতাংশের বেশি। বলে সঠিক বিল্ড আপ হচ্ছে। আর তার পরে সুযোগ বুঝে প্রতিপক্ষের জাল লক্ষ্য করে বিস্ফোরক শট অথবা হেড নিয়ে গোল করে যাচ্ছেন আলবারেস, লাউতারোরা।

    বিশ্বকাপের চার–চারটে নক আউট ম্যাচেই আর্জেন্তিনার এই ধৈর্য ধরে অ্যাটাকটা কার্যকরী হয়েছে। রাউন্ড অফ থার্টি–টুতে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে মেসিদের জয়ের গোল ১১১ মিনিটে। প্রি–কোয়ার্টারে ইজিপ্টের সঙ্গে জয়ের গোল ৯০+২ মিনিটে। কোয়ার্টারে সুইৎজারল্যান্ডের বিরুদ্ধেও ম্যাচটা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। এগোনোর গোল ও জয় নিশ্চিতের গোল ১১২ ও ১২০+১ মিনিটে। আর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল তো রীতিমতো থ্রিলার। পিছিয়ে পড়ে ৮৫ মিনিটে সমতা ফেরানো আর ৯০+২ মিনিটে লাউতারে মার্তিনেসের হেডে দুরন্ত জয়ের গোল। বিশ্বকাপের ইতিহাস বলছে, এর আগে কোনও টিমই নক আউটে এ ভাবে কামব্যাকের অধ্যায় লেখেনি।

    ডাচ–টাচের সঙ্গে মেসিদের মানসিকতাতে যেন জার্মান–জেদ। জার্মান টিমের ভক্তকূল তৈরি হয়েছে তাদের হার না মানা মেজাজের জন্য। চার বার তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। চারবারই ফাইনালে জার্মানরা জয় পেয়েছিল শেষ সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে। ১৯৫৪ সালের ফাইনালে হাঙ্গারির কাছে দু’গোলে পিছিয়ে পশ্চিম জার্মানি ৩–২ করে ৮৪ মিনিটে। ১৯৭৪ সালের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছেও দু’মিনিটে পিছিয়ে ২–১ জিতেছিল পশ্চিম জার্মানি। ১৯৯০ সালের ফাইনালে আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে পশ্চিম জার্মানির ব্রেহমে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন ৮৫ মিনিটে। আর ২০১৪ সালে আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে ফাইনালে গড়িয়েছিল অতিরিক্ত সময়ে। ১১৩ মিনিটে মারিও গোৎসের গোলে বিশ্বকাপ ঘরে তুলেছিল জার্মানি।

    এ বার আর্জেন্তিনা টিমে যেন সেই হার না মানা মেজাজ। ৩৯ বছরের মেসি খুব ভালো করেই জানেন তাঁর পক্ষে ১২০ মিনিট মাঠজুড়ে খেলা সম্ভব নয়। তাই তিনি টিমের অ্যাটাকিংয়ের সময় অদ্ভুতভাবে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন ব্লাইন্ড স্পটে। যেখানে তাঁকে মার্কিং করতে গেলে আলবারেস, লাউতারো, এন্‌সোরা আনমার্কড হয়ে যাচ্ছেন। আর মেসি ব্লাইন্ড স্পট থেকে আচমকাই কিছু পকেট স্পেসে পৌঁছে যাচ্ছেন আচমকা গতি তুলে। এবং সেখান থেকে গোল করে অথবা গোল করিয়ে হয়ে উঠছেন পারফেক্ট ফিনিশার।

    নীল–সাদা শিবিরে ফাইনালের আগে দুশ্চিন্তার কারণ শুধু ডিফেন্স। এই পজিশনেই টিম ‘শেপ’ হারাচ্ছে। তাই হজম করতে হয়েছে ৭ গোল। জার্মান–জেদ, ডাচ–টাচের সঙ্গে যদি স্কোলারি ডিফেন্সে ইতালির ক্যাতানেচিও মেশাতে পারেন, তাহলে স্পেনকে হারিয়ে চতুর্থবারের জন্য বুয়েনস আইরেসে বিশ্বকাপ নিয়ে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা আর্জেন্তিনার।
  • Link to this news (এই সময়)