• আর্জেন্তিনা নাকি স্পেন, মেসি কার? মেগা ব্যাটলের আগে মোহনায় মহাতারকা
    এই সময় | ১৯ জুলাই ২০২৬
  • ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে আজ রাতে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্তিনা ও স্পেন। নিউ জার্সি নিউ ইয়র্ক স্টেডিয়ামে যখন এই দুই শক্তিশালী দল বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে নামবে, তখন ফুটবলবিশ্বের সমস্ত আলো কেড়ে নেবে একটিই নাম—লিওনেল মেসি। কিন্তু এই ফাইনালকে ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের মনে এক অদ্ভুত প্রশ্ন নতুন করে উঁকি দিচ্ছে—মেসি আসলে কার? স্পেনের নাকি আর্জেন্তিনার? কেন তিনি স্পেনের বদলে আর্জেন্তিনার জার্সি বেছে নিয়েছিলেন? জেনে নিন সেই ইতিহাস।

    লিওনেল মেসির জন্ম আর্জেন্তিনার রোজ়ারিও শহরে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাঁ পায়ের জাদু স্থানীয় ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের কর্তাদের নজর কেড়েছিল। কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সে মেসির জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। চিকিৎসকরা জানান, তিনি ‘গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি’ (Growth Hormone Deficiency) বা হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছেন, যার কারণে তাঁর শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে গিয়েছিল।

    মেসির চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে প্রয়োজন ছিল বিপুল অঙ্কের টাকা, যা তাঁর মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। আর্জেন্তিনার কোনও ক্লাব এই খরচের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। ঠিক তখনই মেসির জীবনে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হয় স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনা। বার্সার তৎকালীন ডিরেক্টর কার্লোস রেক্সাচ মেসির খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাৎক্ষণিকভাবে একটি ন্যাপকিন পেপারে চুক্তি সই করিয়ে নেন।

    ১৩ বছর বয়সে মেসি আর্জেন্তিনার রোজ়ারিও ছেড়ে পাড়ি জমান স্পেনের বার্সেলোনায়। বার্সেলোনা তাঁর চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহন করে। এরপর শুরু হয় বার্সার বিখ্যাত যুব অ্যাকাডেমি ‘লা মাসিয়া’-তে (La Masia) মেসির প্রশিক্ষণ। হরমোনের সমস্যা কাটিয়ে লা মাসিয়ার কঠোর শৃঙ্খলা ও প্রশিক্ষণে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন মেসি। সেখান থেকে বার্সেলোনার সিনিয়র দলে সুযোগ পাওয়া এবং পরবর্তীতে ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা হয়ে ওঠা—সবই স্পেনের মাটিতে বসেই লিখেছিলেন এই খুদে জাদুকর।

    ২০০৩-২০০৪ সালের দিকে মেসি যখন বার্সেলোনার যুব দলে, তখন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (RFEF) তাঁর অবিশ্বাস্য প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। স্পেনের যুব দলের তৎকালীন কোচদের নজর ছিল মেসির ওপর। মেসি যেহেতু দীর্ঘদিন স্পেনে ছিলেন, তাই খুব সহজেই তিনি স্পেনের নাগরিকত্ব ও তাদের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেতে পারতেন। স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে মেসিকে স্পেনের লাল জার্সি (La Roja) গায়ে জড়ানোর জন্য প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।

    স্পেন দলে খেললে মেসি হয়তো জ়াভি, ইনিয়েস্তা, পুয়োলদের সঙ্গে ২০১০ সালের বিশ্বকাপ এবং ২০০৮ ও ২০১২ সালের ইউরো কাপ অনায়াসে জিতে নিতে পারতেন। কিন্তু মেসি সেই লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। স্পেনের মাটিতে বড় হলেও তাঁর ধমনিতে বইছিল আর্জেন্তিনার রক্ত। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন কখন তাঁর মাতৃভূমি থেকে ডাক আসবে।

    অবশেষে ২০০৪ সালে আর্জেন্তিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) তড়িঘড়ি করে একটি অনূর্ধ্ব-২০ প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করে মেসিকে আর্জেন্তিনার জার্সি পরানোর জন্য। মেসি কোনও দ্বিধা ছাড়াই আর্জেন্তিনার নীল-সাদা জার্সি বেছে নেন। পরবর্তীতে তিনি আর্জেন্তিনাকে কোপা আমেরিকা ও ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ এনে দিয়ে প্রমাণ করেন, তাঁর হৃদয়ের সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক ছিল।

    মেসি আর্জেন্তিনার হয়ে খেললেও স্পেনকে তিনি কখনও ভুলতে পারেননি। জীবনের ২০টিরও বেশি বছর তিনি কাটিয়েছেন স্পেনের বার্সেলোনা শহরে। তাঁর কেরিয়ারের উত্থান, সাফল্য, ব্যালন ডি'অর জয়, এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সন্তান-সংসার—সব কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে স্পেন। মেসি নিজে বহু সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, স্পেন বরাবরই তাঁর কাছে একটি ‘সেকেন্ড হোম’ বা দ্বিতীয় বাড়ি। স্পেনের ভাষা, সংস্কৃতি এবং বিশেষ করে কাতালুনিয়ার মানুষ তাঁকে যে ভালোবাসা দিয়েছে, তা মেসির হৃদয়ে চিরকাল বিশেষ স্থান জুড়ে থাকবে।

    মেসির বর্তমান ক্লাব ইন্টার মায়ামির কর্ণধার ডেভিড বেকহ্যাম জানিয়েছেন, মেসি অবসরের পর বার্সেলোনা ক্লাবের কাছে থাকবেন বলে পরিকল্পনা করেছেন। অন্যদিকে বার্সার নতুন স্টেডিয়াম দেখতে রাতে আচমকাই হাজির হয়েছিলেন মেসি। বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে মন্তব্য করার সময় মেসি জানিয়েছিলেন, ইয়ামালের ভালো চান তিনি কারণ ইয়ামালের ভালো হলে তাঁর ক্লাব বার্সেলোনার ভালো হবে।

    আজকের ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে যখন আর্জেন্তিনা ও স্পেন মুখোমুখি হবে, তখন মেসির মানসিক অবস্থানটা হবে চ্যালেঞ্জের। একদিকে তাঁর বুকে রয়েছে নিজের মাতৃভূমি আর্জেন্তিনা, যার জন্য তিনি নিজের জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়তে প্রস্তুত এবং যাকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে রয়েছে স্পেন, যে দেশ তাঁকে আজকের ‘লিওনেল মেসি’ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

    বিশেষ করে স্পেনের বর্তমান দলে খেলছেন লামিন ইয়ামালের মতো তরুণ তুর্কি, যিনি মেসির প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনারই বর্তমান ভবিষ্যৎ। তাই স্পেনের ফুটবলের উন্নতি মানেই মেসির প্রিয় ক্লাবেরও ভালো হওয়া। আজকের ম্যাচে মেসি মাঠে নামবেন আর্জেন্তিনার অধিনায়ক হিসেবেই, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের এক কোণে স্পেনের প্রতি থাকবে গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ। জন্মভূমি বনাম কর্মভূমির এই মহা-লড়াইয়ে কাপ যার হাতেই উঠুক না কেন, ফুটবল ইতিহাসের এই রোমাঞ্চকর উপাখ্যানের রিং মাস্টার কিন্তু একজনই—লিওনেল মেসি।

    FAQ

    হ্যাঁ, লিওনেল মেসি ২০০৫ সালে স্পেনের দ্বৈত নাগরিকত্ব (Dual Citizenship) নেন। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনি আর্জেন্তিনার প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন।

    ছোটবেলায় লিওনেল মেসি ‘গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি’ (Growth Hormone Deficiency) রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যার কারণে তাঁর শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছিল। স্পেনের বার্সেলোনা ক্লাব এই চিকিৎসার খরচ বহন করেছিল।

    স্পেনের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ এবং প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও মেসি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তিনি মন থেকে নিজেকে সর্বদা আর্জেন্তাইন ভাবতেন এবং নিজের জন্মভূমির হয়ে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখতেন।

  • Link to this news (এই সময়)