নিতাই রক্ষিত
ডানহাতে বাঁশের কঞ্চি। বাঁ হাতে চটের ব্যাগ। মোরাম বিছানো লাল পথ ধরে হনহন করে হাঁটছে রতনের বৌ। ভোরের আলো সবে ফুটেছে। জঙ্গলমহলের গাছগুলোর মাথা ছুঁয়ে সূর্য এখনও পুরোপুরি ওঠেনি। রোদ বেরোনোর আগেই জঙ্গলে পৌঁছতে হবে। দেরি হলেই ভিড় জমে যাবে খুব। তখন আর বেশি ‘কুড়কুড়ে ছাতু’ মিলবে না। এই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই দ্রুত পা চালাল রতনের বৌ।
বর্ষা এলেই ইলিশের অপেক্ষায় দিন গোনে বাঙালি। ওপার বাংলা থেকে কত এল? দরদাম কী যাচ্ছে? বাজারজুড়ে শুরু হয়ে যায় হিসেব-নিকেশ। আর জঙ্গলমহল জুড়ে চলে ‘কুড়কুড়ে ছাতু’ কুড়োনোর ধুম। এগুলো আসলে এক ধরনের বুনো ছত্রাক। বিজ্ঞানসম্মত নাম Astraeus hygrometricus। শাল, পিয়াল, হরীতকী, বহেড়ার গোড়ায় গজায়। জঙ্গলমহলের মানুষ তাকেই আদর করে ‘কুড়কুড়ে’ বা ‘পুটকা’ নামে ডাকে। আসলে ‘পুটকা’ মানে ছোট। এই ছত্রাকগুলিও ২-৩ সেন্টিমিটার চওড়া বা গোল। তাই বোধহয় এমন নাম।
বর্ষার দিনগুলোতে ভোর হলেই বেরিয়ে পড়েন জঙ্গলমহলের ছেলে-বৌরা। মাথায় একটা প্লাস্টিকের চাদর, হাতে কঞ্চি আর ব্যাগ। জঙ্গলের রাস্তায় কোথায় কী বিপদ লুকিয়ে থাকে, হাতে একটা লাঠি থাকা ভালো। আর জল-ঝড় থেকে বাঁচতে প্লাস্টিক। রাস্তার ধারে, গাছের গোড়ায় চোখ রেখে হাঁটতে থাকেন তাঁরা। যে ভাবে ‘ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর’, অনেকটা যেন সেই রকম।
পুটকা ছাতু বা এই ছত্রাক মাটির রঙের সঙ্গে এমনভাবে মিশে থাকে, অচেনা চোখে তাকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু অভিজ্ঞ হাত জানে, কোথায় একটু খুঁড়লেই তার দেখা মিলবে। বাইরের শক্ত খোলস ছাড়ালেই বেরিয়ে পড়বে তুলোর মতো নরম সাদা অংশ। সর্ষের তেল, কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ আর সামান্য মশলার ছোঁয়ায় সেই ছাতুর স্বাদ ইলিশকেও হার মানায়। লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে জঙ্গলের ভেজা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে ছাতু খুঁজছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের কার্তিক মুর্মু। একগাল হেসে বললেন, ‘এই সব খেয়েই আমরা একটু ভিটামিন পাই আর কী!’
উইয়ের ঢিপির পাশে জন্মানো তর্মাল ছাতু নিয়েও কম উন্মাদনা নেই। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এর স্বাদ সবার থেকে আলাদা। পাশাপাশি হলুদ ছাতুরও আলাদা কদর রয়েছে। কারও বাড়িতে ভাজা হয়, কারও ঝোল, কোথাও আবার ঝাল মশলায় কষিয়ে তৈরি হয় একেবারে বনজ স্বাদের পদ।
তবে শুধু রান্না নয়। অনেকে ব্যাগ বা ঝুড়ি ভর্তি করে ছাতু নিয়ে হাটে যান। বিক্রি করেন। তাঁদের কাছে এটা বাড়তি উপার্জনের মরশুম। সকালে লোকজন ভিড় করে কেনে। শুধু আশপাশের গ্রাম নয়, শহর থেকেও বহু মানুষ ছাতুর খোঁজে আসেন। বাড়তি ভিটামিন বলে কথা! ভালো মানের ছাতু পড়ে থাকে না। চোখের নিমেষে বিক্রি হয়ে যায়। তবে সব লাভ ঘরে তুলতে পারেন না জঙ্গলমহলবাসী। শুকনো হেসে কার্তিক বলছিলেন, ‘প্রতিদিন তো হাটে যেতে পারি না। ফড়েদের দিয়ে দিই। ওরা ১০০-১৫০ টাকা কেজিতে কিনে ৩০০-৩৫০ টাকায় বিক্রি করে। কখনও আরও বেশি দামে।’
ছাতুর আসল দাম তাঁদের কপালে জোটে না। বাজারে পৌঁছতে পৌঁছতে লাভের সিংহভাগই চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। তবু বর্ষা এলে জঙ্গলমহলের মানুষ আবারও জঙ্গলে যান। এ তো শুধু রোজগারের টান নয়, সম্পর্কেরও বন্ধন। এই জঙ্গল তাঁদের পূর্বপুরুষের মতো। আশ্রয় দিয়েছে, খেতে দিয়েছে, বাঁচতে শিখিয়েছে। একে কী উপেক্ষা করা চলে?
জঙ্গলমহলের আদিবাসী সমাজের কাছে তাই কুড়কুড়ে ছাতু নিছক খাবার নয়। এটা তাদের সংস্কৃতি, স্মৃতি আর প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের প্রতীক। ছোটবেলায় বাবা-মা কিংবা দাদু-ঠাকুমার হাত ধরে জঙ্গলে যেতে যেতেই শিশু শেখে—কোন ছাতু খাওয়া যায়, কোনটা নয়। কোথায় জন্মায় পুটকা, আর কোথায় তর্মাল। কোনও বইয়ে এই জিনিস লেখা নেই। শুধু রয়েছে বনবাসী মানুষের উত্তরাধিকারে। ছোট শিশুর হাত ধরে জঙ্গলের পথে হাঁটতে হাঁটতে বাবা গান ধরেন, ‘মাড় ভাত আর শুশনি শাক.../ সঁগে পুটকা ছাতুর ঝোল/ ও খুড়ার মসি, টিপিক টিপিক জলে/ আইজ পুটকা কুড়হাতে যাবঅ চল।’