• ভারতচন্দ্রের ‘ঈশ্বরী পাটনি ঘাট’ দেখেছেন? ৩০০ বছর পরেও মেলেনি হেরিটেজ স্বীকৃতি, এ বার আশায় উত্তরসূরিরা
    এই সময় | ১৯ জুলাই ২০২৬
  • গৌতম ধোনি, কৌশিক ভট্টাচার্য

    ‘আমাগো দাদুর দাদুরাই মা অন্নপূর্ণাকে গাঙ পার করাইছিল গো কর্তা।’ ডানহাতটা বুকে ঠেকিয়ে গর্বের সঙ্গে বললেন শুকদেব পাটনি। তার পরেই যেন ডুবে গেলেন কোনও এক অদৃশ্য ভাবনায়। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সরু জলঙ্গি। তিরতিরে জল। ঢেউ নেই। জীবনানন্দ দাস যে কী করে আবার ‘জলঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়’ ফিরবেন, কে জানে?

    শুকদেবের মাথাভর্তি কাঁচা-পাকা চুল। রোদে পোড়া শ্যামলা মুখ। পরনে চেক লুঙ্গি আর মলিন গেঞ্জি। পাশে ঠেস দিয়ে রাখা খেটো লাঠি। জলঙ্গির তীরে বসে খেয়া পারানির কড়ি গুনছেন তিনি। আর মাঝেমধ্যে চোখ তুলে তাকাচ্ছেন নদীর ও পারে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। আর চোখের গভীরে জমা কয়েক পুরুষের অপেক্ষা। সেখানে মিলেমিশে গিয়েছে ঈশ্বরী পাটনির বংশধর হয়েও ইতিহাসের পাতায় স্বীকৃতি না-পাওয়ার আক্ষেপ। প্রায় ৩০০ বছর পরেও হেরিটেজ তকমা না পাওয়ার কষ্ট।

    কৃষ্ণনগর-করিমপুর সড়কের ধারে হাটরা গ্রাম। রাস্তার দু’পাশে নারকেল আর ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। ইতিউতি মাটির বাড়ি। যেন পটে আঁকা ছবি। ইটভাটা স্টপে নেমে পশ্চিমমুখো হয়ে কয়েক পা হাঁটলেই জলঙ্গি। নদিয়ার চাপড়ার হাটরা আর নাকাশিপাড়ার তেঘড়ির মাঝ দিয়ে আপন ছন্দে বয়ে চলেছে। শেষ বিকেলের আলোয় সোনার মতো ঝিকমিক করছে জল।

    আর সময়ের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘ঈশ্বরী পাটনি ঘাট’। তিন-চারটে নৌকা বাঁধা। মাঝিদের গল্প, জেলেদের গান আর অগণিত যাত্রার স্মৃতি বুকে নিয়ে যেন ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছে। ‘অন্নপূর্ণা উত্তরিলা গাঙ্গিনী তীরে/ পার কর বলিয়া ডাকিলা পাটুনীরে/ সেই ঘাটে খেয়া দেয় ঈশ্বরী পাটুনী/ ত্বরায় আনিল নৌকা বামাস্বর শুনি...।’ অন্নদামঙ্গলের সেই অমর দৃশ্য শুধু কাব্যের পাতায় নয়, প্রতিটা পঙক্তি আজও শ্বাস নেয় এখানকার বাতাসে। আর জলঙ্গির তীরে ইতিহাস হয়ে বসে থাকেন শুকদেব নিজেই।

    ছোট্ট খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর। টিনের দেওয়াল। বাইরে একটা সরু বেঞ্চ পাতা। তাতে রোজ এসে বসেন শুকদেব। এটাই তাঁর ঘাঁটি। পাশে একটা টিনের স্যুটকেস। কিছু কাগজ। যাত্রী আসছে, যাচ্ছে। পাটনিরা মিলে একটা বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছেন। তার উপর দিয়ে যেতে গেলে কড়ি গুণতে হয়। শুকদেব হিসেব বুঝে নেন।

    নদীতে জল বেশি নেই। গ্রীষ্মে হেঁটেই পার হওয়া যায়। কিন্তু বর্ষায় যখন দু’কূল ছাপিয়ে যায়, তখন হাল ধরেন শুকদেব পাটনিরা। ধান, পাট থেকে শুরু করে চার চাকার গাড়িও পার হয় মাঝারি আকারের জোড়া নৌকায়। বাকি সময়ে নদীর বুকে বিছিয়ে দেওয়া বাঁশের সাঁকোই হয়ে ওঠে দুই পাড়ের মানুষের ভরসা। তার উপর দিয়েই পার হয় মানুষ, এমনকি ছোট চার চাকার গাড়িও ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে চলে যায় এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে।

    সরকারি নথিতে তাঁর পদবি ‘সরকার’। কিন্তু জলঙ্গির দুই পারে তিনি আজও ‘পাটনি’। শুকদেবের বিশ্বাস, তাঁর রক্তেই বইছে ঈশ্বরী পাটনির উত্তরাধিকার। ঘাটের মাটিতে, জলঙ্গির জলে, নৌকার বৈঠাতে লেখা আছে তাঁর বংশপরিচয়।

    নদীর ওপারে তেঘড়ি গ্রামে অন্নপূর্ণা মন্দির। হালআমলে তৈরি। বাড়ির উঠোনে লাল শাড়ি পরে বসে রয়েছেন অন্নপূর্ণা। সামনে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দেবাদিদেব। বিশ্বাস আর স্মৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে। এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নিত্যানন্দ ঘোষ মনে করিয়ে দিলেন, ‘অন্নদামঙ্গল-এর চরিত্রগুলি নিছক কল্পনার নয়। সবই ইতিহাসের অংশ।’

    মা অন্নপূর্ণা তেঘড়ি গ্রামের জমিদার হরিহোড়ের উপরে রুষ্ট হয়ে তাঁর বাড়ি ছেড়ে কৃষ্ণনগরের জমিদার ভবানন্দ মজুমদারের বাড়ি চলে যাচ্ছেন। ‘রুষ্টা হৈয়া অন্নদা ত্যজিল ভবন/ ভবানন্দ-গৃহে করিল গমন...।’ নিত্যানন্দ বলছেন, ‘হরিহোড় ছিলেন তেঘড়ির জমিদার। আর ভবানন্দ নদিয়ার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।’ মাঝে জলঙ্গি। অন্নপূর্ণাকে পার করাচ্ছেন ঈশ্বরী। নিত্যানন্দের বিশ্বাস, কাব্যে অলৌকিকতা থাকলেও স্থান-কাল-পাত্রের ভিত গভীরভাবে বাস্তব। শুকদেব সেই বাস্তবতারই সাক্ষী।

    শুকদেবে মতোই নদিয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতিপ্রেমীদেরও বিশ্বাস, এই ঘাট নিছক জলঙ্গি পারাপারের পথ নয়, বরং বাংলার লোকস্মৃতি, সাহিত্য আর নদীসভ্যতার এক জীবন্ত দলিল। তাই দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের দাবি, ‘ঈশ্বরী পাটনি ঘাট’-কে হেরিটেজের স্বীকৃতি দিয়ে রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে তুলে আনা হোক।

    ২০২৫-র ডিসেম্বরেও ‘সেভ জলঙ্গি’-র স্বেচ্ছাসেবীরা নদিয়ার জেলাশাসক মারফত রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের কাছে আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলেন। আশা ছিল, ভারতচন্দ্রের কাব্যে অমর হয়ে থাকা এই ঘাটকে স্বীকৃতি দেবে সরকার। আশ্বাসও মিলেছিল। কিন্তু লাল ফিতের ফাঁসে কেটে গিয়েছে দীর্ঘ কয়েক মাস। ঘাটে আজও খেয়া লাগে, নৌকা এসে ভিড়ে, নদী বয়ে যায়... শুধু এসে পৌঁছয়নি স্বীকৃতিটুকুই।

    তবু আশা ছাড়েননি তাঁরা। রাজ্যে পালাবদলের পরে আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন নদী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। ‘সেভ জলঙ্গি’-র সম্পাদক শঙ্খশুভ চক্রবর্তী জোর দিয়ে বললেন, ‘দরকারে ফের সরকারি দপ্তরের দরজায় কড়া নাড়ব।’ তাঁদের বিশ্বাস, ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু কাব্যের পঙক্তিকে নয়, তার জন্মভূমিকেও সার-জল দিতে হয়।

    মেঘলা আকাশ যেন নদীর বুকে নেমে এসেছে। নিঃশব্দ জলরাশির উপরে ভেসে বেড়াচ্ছে ধূসর ছায়া। অল্প অল্প দুলছে বাঁশের সাঁকো। যেন দুই তীর নয়, ঈশ্বরী আর শুকদেবের কালখণ্ডকে জুড়ে দেওয়ার কাজ চলছে। কাঁচা-পাকা দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন শুকদেব, ‘জমিদার কৃষ্ণচন্দ্রের আমল থেকে এই ঘাটে খেয়া বাইত ঈশ্বরী। তবে আমাদের আরও তিন শরিক আছে।’

    ‘রোজগারপাতি কেমন হয় শুকদেব?’ প্রশ্নটা শুনে একবার মুখের দিকে তাকালেন বছর পঞ্চাশ-পঞ্চান্নর প্রৌঢ়। জলঙ্গির মৃদুমন্দ হাওয়া ভেসে আসছে। পশ্চিম আকাশে ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। কোনও গেরস্থ বাড়ির বধূ ঘাটে এসে দাঁড়ালেন। নদী পেরোবেন। পাড়ে নৌকার রশি খুলতে খুলতে কেউ গান ধরল, ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে/ আমি আর বাইতে পারলাম না...।’ সেই সুরের সঙ্গেই যেন মিশে গেল শুকদেবের দীর্ঘশ্বাস, ‘দুধে-ভাতে আর থাকতে পারলাম কই...।

  • Link to this news (এই সময়)