• পালাবদলে হাতবদল, বৃদ্ধার বাড়ি বিজেপি বিধায়কের দখলে
    বর্তমান | ২০ জুলাই ২০২৬
  • বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: মাসখানেক আগে তারকেশ্বর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘পরিবর্তন ভালো লাগছে তো?’ জনতা সমস্বরে উত্তর দিয়েছিল ‘ভালো লাগছে’! তবে দক্ষিণ দমদমের বাসিন্দা শিখা চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতা তেমন নয়। তাঁর কাছে ‘পরিবর্তন’ যেন ‘প্রহসন’!  

    স্বামী ও পুত্র মারা গিয়েছেন। একমাত্র কন্যা ক্যান্সার আক্রান্ত। জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত এক অসুস্থ বৃদ্ধা শিখাদেবী। তাঁর নতুন দোতলা বাড়ির দখল নিয়ে তৃণমূল  ওয়ার্ড অফিস করেছিল। রাজ্যে পালাবদলের পর বাড়ি ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন তিনি। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, সেই বাড়ি ফিরে পেতে বর্তমান বিজেপি বিধায়কের বিরুদ্ধেই থানায় অভিযোগ করতে হবে তাঁকে! কারণ, ক্ষমতায় পরিবর্তন হতেই ওই দোতলা বাড়ির স্রেফ ‘দখলদার’ বদল হয়েছে। সবুজ ফ্লেক্সের জায়গা নিয়েছে গেরুয়া ব্যানার। বারবার বিধায়কের কাছে ছুটে গিয়েছেন শিখাদেবী। কিন্তু বাড়ি ফেরত পাননি। 

    শিখাদেবীর স্বামী প্রীতীশ চক্রবর্তী পরিবহণ দপ্তরের আধিকারিক ছিলেন। মধুগড়ের পৈতৃক বাড়িতে থাকার সময় তিনি দক্ষিণ দমদমের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ক্লাইভ হাউসের মাঠ লাগোয়া অংশে জমি কিনেছিলেন। ২০১৬ সালে সেই জমিতে বাড়ি তৈরির কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের মেয়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। ছেলেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতাল, ডাক্তারের কাছে ছুটতে ছুটতে শিখাদেবীর তখন উদভ্রান্তের মতো অবস্থা। তখনই সদ্যনির্মিত ফাঁকা বাড়ির উপর নজর পড়ে স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলার বাপি মিত্রের। অভিযোগ, স্রেফ গায়ের জোরে ওই বাড়ি দখল নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে সেখানে ওয়ার্ড অফিসের উদ্বোধন হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। শিখাদেবী বলেন, ‘তখন কতবার গিয়েছি কাউন্সিলারের কাছে। উনি বলেছিলেন, ফাঁকা ঘর বলে ব্যবহার করছি। আপনারা এলে ছেড়ে দেব। ২০১৮ সালে স্বামী মারা গেল। ২০২২ সালে ছেলেও। মেয়ের আগেই ক্যান্সার ধরা পড়েছে। বাধ্য হয়ে আমি দমদমের হরকালী কলোনিতে মেয়ের আবাসনে চলে যাই। আমি নিজেও অসুস্থ। তারপরও কালীঘাটে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে দরবার করেছি। ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস, থানা-পুলিশ কিছুই বাদ রাখিনি। কোনো লাভ হয়নি। পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছিলাম। কিন্তু ফল বেরনোর পর দেখি, বিজেপি বিধায়ক অরিজিৎ বক্সির নেতৃত্বে আমার বাড়ির রং বদল হয়ে গিয়েছে। তারপর তিনবার ওঁর অফিসে গিয়েছি। কখনও উনি আমাকে একতলায় থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কখনও বলেছেন, নীচের তলা ১০ বছরের জন্য ভাড়ায় দিয়ে দিতে। শেষবার বলেছেন, পুরভোটের আগে তিনি কিছু করতে পারবেন না। তাই বাধ্য হয়ে নাগেরবাজার থানায় অভিযোগ জানিয়েছি।’ বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের বাড়িতেও তিনি গিয়েছিলেন। তবে দেখা না হওয়ায় তাঁকে চিঠি পাঠিয়েছেন। বিধায়ক অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘কত তৃণমূল পার্টি অফিস আমি দাঁড়িয়ে থেকে ফেরালাম! কেন আমার নামে এমন অভিযোগ, বলতে পারব না। শুনেছি, ওই বাড়িতে তৃণমূল ওয়ার্ড অফিস চালাত। এখন কাউন্সিলার না থাকায় আমাদের ছেলেরা ওখান থেকে সরকারি পরিষেবা দেওয়ার কাজ করে। আমি নিজে কখনও যাইনি। উনি একবার জনকল্যাণ শিবির চলার সময় আমার কাছে এসেছিলেন। বলেছিলাম, এই ব্যস্ততার মধ্যে এত কাগজ দেখা সম্ভব নয়। পরে আসতে। ওঁর বৈধ কাগজপত্র থাকলে বাড়ি উনিই পাবেন। জবরদখল, গুন্ডারাজ দমদমে চলবে না।’ 
  • Link to this news (বর্তমান)