সৌমিত্র ঘোষ, ডোমজুড়
রাজ্যে পালা বদলের পরে নতুন সরকারের দু'মাস কেটে গেলেও, হাল ফেরেনি হাওড়ার অধিকাংশ রাস্তার। বালি থেকে হাওড়া ও হাওড়া থেকে ডোমজুড়, সর্বত্রই ভরা বর্ষায় রাস্তার বেহাল দশায় ক্ষোভ বাড়ছে ভুক্তভোগীদের। দিন কয়েক আগে রাতে হাওড়া-আমতা রোডে বাঁকড়ায় ভাঙাচোরা রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি ট্রেলারের ধাক্কায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এক টোটো চালকের।
ঘটনার পরে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে অবরোধ ওঠে। কিন্তু স্থানীয়দের বক্তব্য, তৃণমূল জমানা থেকেই বাঁকড়ার রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। একমাত্র বড় রাস্তা হাওড়া আমতা রোড ধরেই অসংখ্য স্কুল পড়ুয়া থেকে নিত্যযাত্রীদের যাওয়া আসা করতে হয়। গ্রামীণ হাওড়ার অসংখ্য রুটের বাস চলে এই রাস্তায়। ভাঙাচোরা রাস্তায় প্রাণ হাতে করেই বাইকে বা টোটোয় চেপে পড়ুয়াদের স্কুলে পৌঁছতে যান অভিভাবকরা।
খন্দপথে সামান্য অসতর্ক হলেই মরণফাঁদে বাইক উল্টে বা সাইকেল থেকে পড়ে একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে অনেকের। তাতেও টনক নড়েনি প্রশাসনের। তৃণমূলের দীর্ঘ শাসনে দুর্নীতি ও তোলাবাজির অভিযোগ উঠেছে বারে বারে। অভিযোগ ছিল, দুর্নীতির কারণে রাস্তার জন্য বরাদ্দ টাকায় ভাগ বসিয়েছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। ফলে, রাস্তা বানানোর অল্প দিনের মধ্যেই ভারী ট্রাক ও ট্রেলারের চাকার চাপে তা ভেঙেচুরে গিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু রাজ্যে পট পরিবর্তনের পরে দু'মাস অতিক্রান্ত। ভাঙাচোরা রাস্তায় বর্ষায় যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, তা তো আগাম জানতেন সরকারি আধিকারিকরা। তা সত্ত্বেও তাঁরা ব্যবস্থা নেননি কেন, এই প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।
হাওড়া-আমতা রোড রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাজ্যের পূর্ত দপ্তরের। গত কয়েক বছর ধরেই দপ্তরের কাজকর্মে খুশি নন সাধারণ মানুষ। বাঁকড়া থেকে সলপ, কাটলিয়া হয়ে মাকড়দহ পর্যন্ত খন্দপথের হাল ফেরানোর দাবিতে রাজ্যে তৃণমূলের সরকার থাকাকালীন বহু বিক্ষোভ, আন্দোলন ও পথ অবরোধের ঘটনা হয়েছে গত দু'আড়াই বছরে। সাধারণ মানুষের স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদের পাশাপাশি, সিপিএম ও বিজেপির মতো সে সময়ের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি তাদের যুব ও মহিলা গণসংগঠনের নেতৃত্বে দফায় দফায় আন্দোলন হয়েছে।
ভোটের আগে হাওড়া-আমতা রোডের কিছু কিছু অংশে পেভার ব্লক বসিয়ে কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টাও করেছে পূর্ত দপ্তর। কিন্তু এই বর্ষায় কোথাও পেভার ব্লক উঠে গিয়ে, কোথাও রাস্তার অ্যাসফল্ট উঠে বড়সড় গর্তে জল জমে যান চলাচল দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ গাড়ি চালক, বাইক ও টোটো চালক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বড় অংশের। কাটলিয়ার বেশ কয়েকটি জায়গায় হাওড়া-আমতা রোডের উপরে বৃষ্টির জল জমে রীতিমতো পুকুর তৈরি হয়ে গিয়েছে। জলের নীচে রাস্তার বড় গর্ত সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চালকরা।
সাবধানে, অতি ধীরে ওই অংশ পার হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়ায়, ব্যস্ত সময়ে বাড়ছে যানজট। মাকড়দহেও রাস্তার অবস্থা সুবিধার নয়। মাকড়দহের পর থেকে ডোমজুড় পর্যন্ত রাস্তা বেশ ভালো করে বানানো হয়েছিল ভোটের আগে। কিন্তু ডোমজুড় গ্রামীণ হাসপাতালের সামনে প্রায় ৫০ ফুট রাস্তার অংশে অজানা কারণে কাজ না হওয়ায়, সেখানেও বড়সড় গর্তে বর্ষার জল জমে পরিস্থিতি সঙ্গীন। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পরে গত দু'মাসে হাওড়া জেলা পরিষদের কাজকর্ম শিকেয় উঠেছে। নতুন সভাধিপতি ও সহ সভাধিপতি দায়িত্বভার নিলেও, এ পর্যন্ত গতি আসেনি জেলা পরিষদের কাজে।
রাজ্যের পূর্ত দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে হাওড়া-আমতা রোডের মতো জেলার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার হাল ফেরাতে জেলা পরিষদের কোনও ভূমিকা নজরে আসেনি। স্থবির হয়ে পড়েছে ব্লক স্তরে পঞ্চায়েত সমিতি ও তার নীচে থাকা গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিও। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মে অন্তত আগামী তিন মাস বর্ষা চলতে পারে বলে খবর। জুলাইয়ের মাঝেই রাস্তার এই হাল হয়ে পড়ায়, আগামী দিনগুলি যে কতটা ভয়াবহ হতে চলেছে, তা ভেবেই আতঙ্কিত মানুষ। তবে জেলা পরিষদের নতুন সহ সভাধিপতি তুষার ঘোষ বলেছেন, 'হাওড়া-আমতা রোডের দেখভালের দায়িত্ব জেলা পরিষদের হাতে নেই। আমাদের স্থায়ী কমিটির আগামী সভায় আমরা বিষয়টি পূর্ত দপ্তরের নজরে আনব।'
হাওড়া পূর্ত দপ্তরের এক আধিকারিকের কথায়, 'দাশনগরের শানপুর থেকে সলপ ব্রিজ পর্যন্ত হাওড়া-আমতা রোডের দেখভাল এখন জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের হাতে। সলপ ব্রিজের পর থেকে পূর্ত দপ্তরের দায়িত্ব। ডোমজুড় গ্রামীণ হাসপাতালের সামনের রাস্তা-সহ যে জায়গাগুলিতে রাস্তার খারাপ অবস্থা, সেগুলি আমরা বৃষ্টি একটু থামলেই করে দেবো।'