ঝলমলে সাইনবোর্ডে লেখা মাত্র দু’টো শব্দ। অথচ কী বিশাল তার ব্যাপ্তি। এতদিনের চেনা সামাজিক অভ্যাস, রীতি-নীতি সব যেন তার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। ‘ঘোষাল অ্যান্ড ডটার’। হাওড়ার নেতাজি সুভাষ রোডে মা-মেয়ের মিষ্টির দোকান। যেন নিঃশব্দ বিপ্লব।
এতদিন তো ‘...অ্যান্ড সন্স’-এই অভ্যস্ত ছিল চোখ। ব্যবসার সাইনবোর্ডেও সেটাই ছিল উত্তরাধিকারের সরকারি ভাষা। যেন ব্যবসা মানেই ছেলের হাতে যাবে, বংশপরিচয় টিকে থাকবে পুত্রের মধ্যে দিয়ে। মেয়ে সেখানে অতিথি, বড়জোড় সহযাত্রী, কিন্তু উত্তরসূরি মোটেই নয়। এতদিনের সেই অলিখিত নিয়মের সামনে দাঁড়ি টেনে দিয়েছেন সুতপা ঘোষাল। এটা তাঁরই মিষ্টির দোকান।
সুতপা নিজেই ছকভাঙা এক জীবনের নাম। তাঁর মিষ্টির দোকান যে এমনটা হবে, তাতে আর আশ্চর্যের কী? বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। তার পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক নিয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি। দীর্ঘদিন দূরদর্শনে ঘোষিকা এবং সঞ্চালিকার দায়িত্ব সামলে হঠাৎই একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন, অনেক হয়েছে। মঞ্চের আলো ছেড়ে তিনি এ বার কাজ করবেন অন্য এক সৃষ্টির জগতে— মিষ্টির ভুবনে।
২০১৮ সালে খুলে ফেললেন মিষ্টির দোকান। ছোট ঘর, সামনে কাচের শো-কেস। তাতে নানা রকমের মিষ্টি সাজানো। আর পাঁচটা দোকান যেমন হয়, সেই রকমই। আলাদা কিছু নেই। অবশ্য তাঁর সবচেয়ে বড় সৃষ্টি কোনও মিষ্টি নয়, সেটা ওই সাইনবোর্ড। যা খদ্দেরকে এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভাবতে বাধ্য করে, কেন ‘অ্যান্ড ডটার’?
জবাবে কোনও রাখঢাক রাখেন না সুতপা। সরাসরি বলেন, ‘আমার একটাই মেয়ে। ভবিষ্যতে ব্যবসা তার হাতেই দিয়ে যেতে চাই। আর যদি ছেলে থাকতও, তা হলে নাম রাখতাম ঘোষাল অ্যান্ড সন্স অ্যান্ড ডটার্স।’ তাঁর কাছে উত্তরাধিকার লিঙ্গের প্রশ্ন নয়, যোগ্যতার প্রশ্ন। এতে কোনও ভেদাভেদ রাখতে চান না তিনি।
সুতপার স্বপ্ন এখানেই থেমে নেই। তিনি চান, ঘোষাল অ্যান্ড ডটার একদিন রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাক। অনেকের কর্মসংস্থান হোক। মহিলারা যেন নিজের পরিচয়ে ব্যবসা শুরু করার সাহস পান।
সমাজের সব বড় পরিবর্তন তো আর রাজপথে হয় না। কখনও কখনও তা একটা সাইনবোর্ড থেকেও শুরু হয়। ভবিষ্যতে হয়তো ‘অ্যান্ড ডটার’ লেখা সাইনবোর্ড দেখে কেউ আশ্চর্য হবে না। তখন সেটাই হবে স্বাভাবিক। সেই দিন হয়তো সুতপার মিষ্টির দোকানের কথা ইতিহাস মনে রাখবে না। কিন্তু মনে রাখবে, এই সাইনবোর্ডই সমাজের বহু পুরোনো ব্যাকরণে প্রথম সংশোধনী লিখেছিল।