কৌশিক দে, মালদা
দু'মাস আগেই মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা 'নাসা'-র তরফে জানানো হয়েছিল, মঙ্গলগ্রহের মাটিতে মানুষের শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন বানিয়ে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষামূলক ভাবে ১২২ গ্রাম অক্সিজেন তৈরি করা হয়েছে একটি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে। এ বার মঙ্গলগ্রহ থেকে শত-লক্ষ যোজন দূরে বাংলার মালদায় বসে এক ব্যবসায়ী অক্সিজেন তৈরি করেছেন। তবে এই অক্সিজেন শ্বাস নেওয়ার জন্য নয়, খাওয়ার জন্য। অ্যাঁ। অক্সিজেন আবার খাওয়া যায় নাকি?
তাজ্জব বনে গিয়ে এমন প্রশ্ন মাথায় আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটাই বাস্তব। মালদার ইংরেজবাজার শহরের ব্যবসায়ী টুনটুন সাহা 'অক্সিজেন' বানিয়েছেন, থুড়ি ফলিয়েছেন। এই 'অক্সিজেন' আদতে আমের একটি প্রজাতি। মালদার হিমসাগর, ল্যাংড়া কিংবা ফজলি আমের স্বাদ কী, তা বাঙালির চেয়ে ভালো কেউ জানে না। এ ছাড়াও গরমকালে লক্ষণভোগ, আম্রপালি, কাটিমন, আলফানসো, কেশর কিংবা বঙ্গনাপল্লি প্রজাতির আমের খোঁজেও ফলের দোকানে ভিড় জমান ক্রেতারা। এর মাঝেই গত ১৫ বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের এক প্রজাতির আম ফলিয়েছেন টুনটুন। এই আমেরই নাম দিয়েছেন 'অক্সিজেন'।
এমন নামকরণের তাৎপর্য কী? টুনটুন বলছেন, 'কয়েক দশক আগে আমার বাবা বাড়ির বাগানে এই আমের চারা রোপণ করেছিলেন। তিনি কোথা থেকে কী ভাবে এটি সংগ্রহ করেছিলেন, সেটা জানি না। বাবা মারা যাওয়ার পরে ঈশ্বরের স্বপ্নাদেশে এই আমকেই অক্সিজেন হিসেবে মানুষের কাছে তুলে ধরার বার্তা পাই। তার পর থেকে সবাইকে বলেছি, এই আমের নাম অক্সিজেন।' তাঁর দাবি, 'এই প্রজাতির আম এতটাই সুস্বাদ যে, একবার খেলে গোটা শরীর একেবারে সতেজ হয়ে যায়। করোনাকালে যেমন মানুষের কাছে অক্সিজেনই হয়ে উঠেছিল প্রধান ভরসা, ঠিক তেমনই আমার গাছের এই আম অক্সিজেনের মতোই মানুষকে বাঁচার ভরসা জোগাবে।'
ইংরেজবাজার পুরসভার ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের স্টেশন রোড এলাকার বাসিন্দা টুনটুন পেশায় পোল্ট্রি ফার্মের মালিক। পরিবারে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে রয়েছেন। তাঁর বাড়িতেই রয়েছে মস্ত বাগান। সেখানেই রয়েছে অসংখ্য আমগাছ। নিজস্ব পদ্ধতিতে জৈব সার প্রয়োগ করে ১৫ বছর ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে অবশেষে সাফল্য পেয়েছেন টুনটুন। সম্প্রতি ব্যাপক ফলন হয়েছে 'অক্সিজেন আম'-এর। এক-একটি আমের ওজন ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম। যার বাজারমূল্য কেজি প্রতি এক হাজার টাকারও বেশি। স্বাদ এবং সুগন্ধের পাশাপাশি এই আম প্রায় তিন সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায় বলে জনিয়েছেন টুনটুন। তাঁর কথায়, 'আগে বৃন্দাবনী নামে আমের একটি প্রজাতি ছিল। এখন খুব একটা পাওয়া যায় না। ওই আমেরও নামকরণ কোনও না-কোনও ভাবে হয়েছিল। পরে সরকারি স্বীকৃতি মিলেছে।' তাঁর আশা, 'আমার অক্সিজেন আমও সরকারি স্বীকৃতি পাবে। প্রশাসনের কাছে সেই আর্জি জানিয়েছি।'
ইতিমধ্যেই 'অক্সিজেন আম'-এর নমুনা জেলা প্রশাসন, উদ্যানপালন দপ্তর এবং মালদা কৃষি বিজ্ঞানকেন্দ্রে পাঠিয়েছেন টুনটুন। কৃষি বিজ্ঞানকেন্দ্রের প্রধান দুষ্মন্তকুমার রাঘব বলেন, 'প্রাথমিক ভাবে এই আমের স্বাদ এবং বৈশিষ্ট্য ব্যতিক্রমী বলেই মনে হয়েছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক নামকরণের আবেদন জানানো হবে।' সরকারি স্বীকৃতি মিললে এই প্রজাতির চারা তৈরি করে বাণিজ্যিক ভাবে চাষের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।' 'অক্সিজেন আম' স্বীকৃতি পেলে টুনটুনের সাফল্যের কথা মানুষ জানতে পারবেন বলে জানিয়েছেন দুষ্মন্ত।