• বঙ্গ-প্রশাসনে বাংলা ভাষা: খুশি বিশিষ্টরা, চাইছেন সঠিক বাস্তবায়ন
    এই সময় | ২১ জুলাই ২০২৬
  • এই সময়: দীর্ঘদিনের আক্ষেপ অবশেষে ঘুচতে চলেছে। বাংলা ভাষা আর কেবল সাহিত্য, গান বা আবেগের মধ্যেই আটকে থাকবে না, এ বার থেকে প্রশাসনের অন্দরেও মাতৃভাষার অবাধ প্রবেশ ঘটতে চলেছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যের সমস্ত প্রশাসনিক কাজ, এমনকী থানায় এফআইআর দায়েরও করা যাবে বাংলায়।

    বিধানসভায় এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা হওয়ার পরে সরকারের পদক্ষেপে অত্যন্ত খুশি বিশিষ্টজনেরা। সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে একটি বিশেষ মর্যাদার আসনে বসানো হলো। বাঙালি হিসেবে আমি খুবই সন্তুষ্ট ও গর্বিত। এটি অত্যন্ত আনন্দের খবর।’ এর পাশাপাশি তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকে প্রয়াত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি এবং আরও অনেকেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সমস্ত স্কুলে বাংলাকে বাধ্যতামূলক করার দাবি তুলেছিলেন। প্রবীণ এই সাহিত্যিকের আশা, বর্তমান রাজ্য সরকার সে বিষয়েও সদর্থক ভূমিকা পালন করবে।

    ভাষাবিদ পবিত্র সরকার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর কথায়, ‘সিদ্ধান্তটি প্রশংসাযোগ্য হলেও সবাই এতে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন, তা ভাবার বিষয়। আমলাদের কঠিন বাংলা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন কি না, কিংবা সঠিক বানানের চর্চা সবার আছে কি না—সে বিষয়ে ভাবা দরকার। তাই নিয়মটি কার্যকর করার আগে সরকারের উচিত কর্মীদের জন্য বিশেষ ওয়ার্কশপ বা প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করা, যাতে ব্যবহারযোগ্য ভাষার রূপটি স্পষ্ট হয়।’

    সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদারও এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাতৃভাষা মানে শুধু মায়ের মুখের ভাষাই নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, প্রকৃতি, ইতিহাসও। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাংলাকে আরও গ্রহণযোগ্য করার উদ্যোগ সরকারই নিতে পারে। কারণ তাদের সেই পরিকাঠামো রয়েছে বড় আকারে ভাষার প্রসার ও প্রচার করার। তাই এই উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।’

    বছর খানেক আগেই আইআইটি খড়্গপুরে ত্রিভাষা সূত্রে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার কথা ঘোষণা করেছিলেন প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা সুমন চক্রবর্তী। নিজের বাংলোর বাইরেও তিনি ইংরেজি, হিন্দির পাশাপাশি বাংলায় নেমপ্লেট লাগিয়েছেন। রাজ্য সরকারের এই ঘোষণার পরে তিনি বলেন, ‘প্রশাসনিক কাজে মাতৃভাষার ব্যবহার খুবই কার্যকরী। বিশেষ করে কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে তা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ইংরেজি বহু মানুষ বুঝতে পারেন না। আবার হিন্দি জানা মানুষের সংখ্যাও এ রাজ্যে খুব বেশি নয়। ফলে কোনও জরুরি প্রশাসনিক বার্তা বাংলা ভাষায় হলে বহু মানুষের কাছে পৌঁছয়।’

    আইআইটি-তে গত এক বছর ধরে এই কাজ শুরু হয়েছে। তবে আগামী দিনে কর্মী, শিক্ষক ও আধিকারিকদের আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। প্রাক্তন আমলা ও সাংসদ জহর সরকার অবশ্য পবিত্রর মতোই মনে করেন এই সিদ্ধান্ত যেন বাস্তবোচিত হয়। তিনি বলছেন, ‘এই সিদ্ধান্তের দুটি ভাগ রয়েছে। প্রথমটি জন সাধারণের জন্য দ্বিতীয়টি সরকারের অভ্যন্তরীণ কাজকর্মে। দুটি ক্ষেত্রেই সহজ সরল ভাষার ব্যবহার প্রয়োজন। জোর করে কোনও শব্দকে অদ্ভুত বাংলায় অনুবাদ করার প্রয়োজন নেই। সে ক্ষেত্রে তা কনফিউশনই তৈরি করবে।’

    সব মিলিয়ে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে চালু হতে চলা এই সিদ্ধান্তের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে সঠিক পরিকাঠামো, আমলাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির মেলবন্ধনের ওপরে, এমনই মতামত বিশিষ্টদের। তবে সমস্ত জটিলতা পেরিয়ে বাংলা ভাষার ইতিহাসে এটি যে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই তাঁদের।

  • Link to this news (এই সময়)