এই সময়: ‘পিঙ্ক’ সিনেমার সেই দৃপ্ত কণ্ঠস্বর আজও অনেকের কানে বাজে— ‘নো মিনস নো’। একটা ছোট শব্দ ‘না’, যার ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু পর্দার বাইরে বাস্তব জীবনে এই একটা ছোট্ট শব্দ উচ্চারণ করাও ভারতীয় নারীর কাছে যে কতটা কঠিন, সম্প্রতি দেশব্যাপী সমীক্ষায় তা উঠে এসেছে। একটি ভোটকুশলী সংস্থার করা সমীক্ষা বলছে, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মহিলা জানেন যে নিজের শরীরের উপরে অধিকার একান্তই তাঁদের। তাঁরা বোঝেন ‘সম্মতি’ বা কনসেন্ট শব্দের গভীরতাও। কিন্তু সচেতনতার স্তরে যে অধিকার স্পষ্ট, বাস্তবে তা প্রয়োগের ক্ষমতা বা স্বাধীনতা অর্ধেকেরও কম মহিলার রয়েছে। ‘না’ বলার অধিকার বেশির ভাগ মহিলারই নেই। তা তিনি বিবাহিতই হোন বা অবিবাহিত! নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র পুরুষদের খুশি করতে প্রতিনিয়ত শারীরিক সম্পর্কে যেতে হয় তাঁদের।
সবচেয়ে উদ্বেগের, কষ্টের জায়গাটা ঘরে। যেখানে সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা, সেখানেই মহিলাদের নিজের ইচ্ছের মূল্য সবচেয়ে কম। সমীক্ষা অনুযায়ী, বিবাহিত বা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে থাকা মাত্র অর্ধেক মহিলা বলতে পেরেছেন যে তাঁদের অনিচ্ছা বা ‘না’-কে নিজের সঙ্গী সম্মান জানান। বাকি অর্ধেক নারী প্রতি রাতে নিজের ‘না’-কে প্রত্যাখ্যাত হতে দেখেও চুপ থাকতে বাধ্য হন। সমীক্ষায় অংশ নিয়ে বিপুল সংখ্যক নারী জানিয়েছেন, সংসারে শান্তি বজায় রাখতে, ঝগড়াঝাটি এড়াতে তাঁরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সঙ্গীর শারীরিক চাহিদা মেনে নেন।
অথচ বিবাহিত জীবনেও যে অসম্মতিতে জোর খাটানো অপরাধ, সেই চেতনা এখন দেশের সিংহভাগ নারীর রয়েছে। তাঁরা চান ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’-এর অভিযোগ আইনি স্বীকৃতি পাক। বিভিন্ন শ্রেণি, বর্গ, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং গ্রাম–শহর মিলিয়ে প্রায় ৬০০০ মহিলার উপরে হওয়া সমীক্ষায় ৫১% মহিলা জানিয়েছেন, বিবাহিত জীবনে বা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কে তাঁরা সঙ্গীকে যৌনতার ক্ষেত্রে ‘না’ বলতে পারেন এবং সেই ‘না’-কে সম্মান জানানো হয়। বাকিদের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা অপরাধবোধ তৈরি করে কার্যত শারীরিক সম্পর্কে যেতে বাধ্য করা হয়। ৬৬% মহিলা বিশ্বাস করেন যে বৈবাহিক জীবনেও ধর্ষণ হতে পারে এবং ৭৫% মহিলা এর আইনি স্বীকৃতি চান।
বাইরের জগতটা আরও কঠিন। যদি কোনও মহিলা সাহস করে ‘না’ বলেন, সমাজ তাঁকে সহজে ছেড়ে দেয় না। প্রায় ৭৫ শতাংশ নারীর অভিজ্ঞতা হলো— যে নারী স্পষ্টবক্তা বা নিজের ভালো-মন্দ বোঝেন, তাঁকে সমাজ ‘অহঙ্কারী’, ‘উদ্ধত’ কিংবা ‘চরিত্রহীন’ দাগিয়ে দিতে দ্বিধা করে না। রাস্তাঘাটে চলতে–ফিরতে প্রায় অর্ধেক মহিলাই কোনও না কোনও সময়ে অবাঞ্ছিত স্পর্শের শিকার হন। নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁদের পোশাক বদলাতে হয়, চেনা রাস্তা বদলাতে হয়, বদলে ফেলতে হয় যাতায়াতের সময়ও।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও একটি বড় সত্যি সামনে এসেছে। তা হলো—অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব। শুধু ডিগ্রি বা উচ্চশিক্ষা কোনও মহিলাকে সুরক্ষিত করতে পারে না, যদি না তাঁর নিজস্ব উপার্জনের জোর থাকে। দেখা গিয়েছে, একজন কম শিক্ষিত কিন্তু আর্থিক ভাবে স্বাধীন নারী একজন উচ্চশিক্ষিত কিন্তু নির্ভরশীল নারীর চেয়ে অনেক বেশি সাহসের সঙ্গে নিজের অধিকারের কথা বলতে পারেন।
‘নো মিনস নো’-কে সিনেমার পর্দা থেকে বাস্তবে, ব্যক্তিগত পরিসরে কি আনতে পারবে এই সমীক্ষা? প্রশ্নগুলো সহজ হলেও উত্তর আপাতত অজানাই!
প্রায় ৮০% নারী জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের শরীরের উপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সম্পর্কে সচেতন।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ৫১% নারী জানিয়েছেন তাঁদের সঙ্গী তাঁদের অসম্মতি বা ‘না’কে সম্মান করেন।
সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক নারী জীবনের কোনও না কোনও সময় অবাঞ্ছিত স্পর্শের শিকার হয়েছেন।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, আর্থিকভাবে স্বনির্ভর নারীরা নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োজন হলে ‘না’ বলার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি আত্মবিশ্বাসী।