• রাসায়নিক নয়, ফলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মেধার বিকাশের উপায়, যুগান্তকারী গবেষণা মেদিনীপুরের গবেষকদের
    এই সময় | ২১ জুলাই ২০২৬
  • সুমন ঘোষ

    পড়ুয়াদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে কুলেখাড়ার ব্যবহার বহু প্রাচীন। বৈজ্ঞানিকরাও এই দাবি সমর্থন করেন যে, কুলেখাড়া খাওয়ানো হলে পড়ুয়াদের স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় স্মৃতিশক্তির বিকাশে এবং পড়ুয়াদের মেধা বাড়াতে রাসায়নিক বা ওষুধও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু, রাসায়নিক কোনও পদার্থ ব্যবহার না করেই কি পড়ুয়াদের মেধা বাড়ানোও সম্ভব? সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্যই। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত মেদিনীপুর সিটি কলেজের একদল অধ্যাপক-গবেষকের এই বিশেষ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক পত্রিকা ‘ফাইটোথেরাপি রিসার্চ’ (Phytotherapy Research)-এ।

    কোথায় হয়েছে এই গবেষণা?

    মেধার বিকাশে প্রাকৃতিক কোনও উপাদান ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত মেদিনীপুর সিটি কলেজের অধ্যক্ষ সুদীপ্ত চক্রবর্তীর নেতৃত্বে গবেষক শিক্ষার্থী আমিনা খাতুন, সুরেন্দ্র পাত্র এবং সুশোভন চৌধুরী এই গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন। কলেজের বায়োলজিক্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের গবেষকরা এই গবেষণা করেছেন। এই গবেষণায় তাঁরা দেখেছেন ফলের মধ্যে থাকা সিরিঞ্জিক অ্যাসিড মেধা এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

    কেন মেধার বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়?

    গবেষকরা জানাচ্ছেন, মস্তিষ্কের নিউরনের নমনীয়তা বা ‘নিউরোনাল প্লাস্টিসিটি’ (Neuronal Plasticity) এবং স্মৃতি সংস্থাপনের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘ক্রেব’ (CREB) নামে একটি প্রোটিন। এই প্রোটিনের কার্যকারিতা হ্রাস পেলে মানুষের নতুন কিছু শেখার বা মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। ক্রেবের পরিমাণ কমে গেলে মস্তিষ্কে ক্যালসিয়ামের প্রবাহ কমে যায় এবং জিনের বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

    কী ভাবে গবেষণা?

    এই বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষার জন্য গবেষকরা কয়েকটি ইঁদুরের উপরে পরীক্ষা চালান। একটি বৃত্তাকার সারফেসের উপরে অনেকগুলু ছোট ছোট গর্ত করে এক বিশেষ গোলকধাঁধা তৈরি করেন। এই গোলকধাঁধার গর্তগুলির মধ্যে মাত্র একটি গর্তেই খাবার ছিল। সেই খাবার খুঁজে বের করে প্রথম দিন খিদে মেটায় ইঁদুরের দল। দ্বিতীয় দিন ওই ইঁদুরগুলিকে অভুক্ত অবস্থায় অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়। এরপরের দিন ওই ইঁদুরগুলিকে ফের ওই গোলকধাঁধায় রেখে দেওয়া হয়। তৃতীয় দিনের সেই পরীক্ষায় দেখা যায় কেবল মাত্র একটি ইঁদুরই খাবার খুঁজে বের করতে পারে। অসফল হওয়া ইঁদুরদের কোষ নিয়ে পরীক্ষা করে দেখা যায় তাঁদের মস্তিষ্কে হিপোক্যাম্পাস ‘ক্রেব’ প্রোটিনের উপস্থিতি সফল ইঁদুরের তুলনায় কম।

    এরপরে ওই অসফল ইঁদুরদের দেহে সিরিঞ্জিক অ্যাসিড প্রয়োগ করা হয়। ইঁদুরগুলির দেহে টানা ৩০ দিন ধরে নির্দিষ্ট মাত্রায় (প্রতি কেজি ওজনের সাপেক্ষে ৫০ মিলিগ্রাম) সিরিঞ্জিক অ্যাসিড প্রয়োগ করা হয়। এক মাস পরে আবার ওই গোলকধাঁধায় পরীক্ষা করতেই চমকে যান তাঁরা। এ বার গোলোকধাঁধাঁ অতিক্রম করে সহজেই খাবারের গর্ত খুঁজে পেয়ে যায় ইঁদুরের দল।

    কী খুঁজে পেলেন গবেষকরা?

    গবেষকদের দাবি, এক মাস সিরিঞ্জিক অ্যাসিড প্রয়োগে তিনটি জিনিসের উন্নতি ঘটেছে। প্রথমত, সিরিঞ্জিক অ্যাসিড খাওয়া ইঁদুরগুলো সহজেই লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পেয়েছে। এ ছাড়াও, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এবং মস্তিষ্কের নিউরনে স্মৃতিবর্ধক কণা ও ক্রেব প্রোটিনের সক্রিয়তা এতটাই বেড়েছে।

    গবেষকদের মতে, এই সিরিঞ্জিক অ্যাসিড কোনও কৃত্রিম রাসায়নিক নয়। জলপাই, খেজুর, আঙুর, স্কোয়াশ, মধুর মতো উপাদানের মধ্যে রয়েছে এই অ্যাসিড। গবেষকদের দাবি, এর কোনও ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই।

    গবেষকরা জানিয়েছেন, এই সাফল্য শুধুমাত্র মেধার বিকাশ ঘটানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। ডিমেনশিয়া, অ্যালঝাইমার্সের মতো জটিল স্নায়ুর রোগের চিকিৎসাতেও যুগান্তকারী ভূমিকা নিতে পারে। সুদীপ্ত জানান, ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (ICMR)-এর অর্থ সাহায্যে গবেষণাটি হয়েছে। মানুষের দেহে প্রয়োগের অনুমতি মেলে এবং ভবিষ্যতে গবেষণা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, সে ব্যাপারেও চেষ্টা চলছে।’ মেদিনীপুর সিটি কলেজে বর্তমানে আধুনিক গবেষণার জন্য পরিকাঠামো তৈরি করেছেন ডিরেক্টর প্রদীপ ঘোষ। তারপর থেকেই গবেষণার কাজে একের পর এক সাফল্যও মিলছে।

    রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার না করে প্রাকৃতিকভাবে মেধা এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির উপায় খুঁজে বের করাই ছিল এই গবেষণার মূল বিষয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ফলের মধ্যে থাকা 'সিরিঞ্জিক অ্যাসিড' মানুষের মেধা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।

    বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত মেদিনীপুর সিটি কলেজের বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের ল্যাবে এই গবেষণাটি করা হয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষ সুদীপ্ত চক্রবর্তীর নেতৃত্বে গবেষক শিক্ষার্থী আমিনা খাতুন, সুরেন্দ্র পাত্র এবং সুশোভন চৌধুরী এই গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।

    এই যুগান্তকারী গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-পত্রিকা ‘ফাইটোথেরাপি রিসার্চ’ (Phytotherapy Research)-এ প্রকাশিত হয়েছে।

    গবেষকদের মতে, মস্তিষ্কের নিউরনের নমনীয়তা এবং স্মৃতি ধরে রাখার মূল চালিকাশক্তি হলো ‘ক্রেব’ (CREB) নামক একটি প্রোটিন। এই প্রোটিনের কার্যকারিতা কমে গেলে মস্তিষ্কে ক্যালসিয়ামের প্রবাহ কমে যায়, যার ফলে মানুষের নতুন কিছু শেখার বা মনে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

    সিরিঞ্জিক অ্যাসিড কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক নয়, এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক একটি উপাদান। মূলত জলপাই, খেজুর, আঙুর, স্কোয়াশ এবং মধুর মতো প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যে এই অ্যাসিড পাওয়া যায়। গবেষকদের দাবি অনুযায়ী এর ক্ষতিকর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

    গবেষকদের মতে, এই সাফল্য শুধুমাত্র সাধারণ মেধা বিকাশে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া এবং অ্যালঝাইমার্সের মতো জটিল স্নায়বিক রোগের চিকিৎসাতেও এটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (ICMR)-এর অর্থ সাহায্যে হওয়া এই গবেষণাটি ভবিষ্যতে মানবদেহে প্রয়োগের চেষ্টা চলছে।

  • Link to this news (এই সময়)