কৌশিক ভট্টাচার্য ও সুমন ঘোষ
দ্রুত পায়ে নাড়াজোল রাজবাড়ির দালানে ঢুকলেন এক যুবক। মাথার সামনেটা টাক। চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। পরনে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি। নীচু মোড়ায় বসে হাত নেড়ে কিছু একটা বলছেন তিনি। মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে তাঁর মুখের অভিব্যক্তি—কখনও কঠোর, কখনও মৃদু হাসিমাখা। তাঁকে মৌমাছির মতো ছেঁকে ধরে আছেন শত শত মানুষ। চক-মিলানো দালানের একটা কোণও ফাঁকা নেই। মাঝে মধ্যেই গুঞ্জন উঠছে। তিনি তাকাতেই চুপ করে যাচ্ছে সবাই।
তিনি রাজা নন, কিন্তু রাজার চেয়েও যেন বেশি কিছু। স্বাধীনতার স্বপ্ন তখনও অধরা। অথচ রাজবাড়ির দালানে বসে থাকা ওই তরুণের কথায় শত শত মানুষ নিঃশব্দে শুনছে ভবিষ্যতের ভারতকে। পাশ থেকে একজন বলে উঠলেন, ‘সুভাষ, এ বার উঠতে হবে।’ তিনি ভিড়ের দিকে একবার তাকালেন। তার পরে স্মিত হেসে ঢুকে গেলেন অন্দরমহলে।
ইতিহাস কখনও হঠাৎ করে হারিয়ে যায় না। সে প্রথমে দেওয়ালের পলেস্তরা খসায়, কার্নিশে আগাছা জন্মাতে দেয়, দরজা-জানলার পাল্লা ভাঙে। তার পরে একদিন মানুষই তাকে ভুলে যায়। ইতিহাসের এই ক্রমকে নিঃশব্দে চ্যালেঞ্জ করছে পশ্চিম মেদিনীপুরের নাড়াজোল রাজবাড়ি। ক্যালেন্ডারের পাতায় দুই দশকেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে। হেরিটেজ তকমা মিললেও নাড়াজোল রাজবাড়িকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (এএসআই) হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি এখনও। পালাবদলের পরে হবে?
পশ্চিম মেদিনীপুর শহরের কোলাহলকে পিছনে ফেলে সড়কপথে মিনিট চল্লিশ এগোলেই নাড়াজোল। ট্রেনে পাঁশকুড়ায় নেমে গাড়িতেও যাওয়া যায়। পথ যত এগোয়, বদলে যায় দৃশ্যপট। কংক্রিট মিলিয়ে যায় সবুজের ভাঁজে। দূরে তাল, শাল, আমবাগানের মাঝে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে এক প্রাসাদ—নাড়াজোল রাজবাড়ি। তাকে চারদিক থেকে জড়িয়ে রেখেছে চারটি নদী। উত্তরে শিলাবতী, দক্ষিণে কংসাবতী, পূর্বে কাঁকি আর পশ্চিমে পারাং।
‘নাড়াজোল’ শব্দটির উৎস ‘নাড়াজোট’ থেকে। ‘নাড়া’ মানে খড়, আর ‘জোট’ অর্থে ছোট নদী। চারদিকের ক্ষুদ্র জলধারা আর নদীবিধৌত ভূখণ্ড থেকেই জন্ম নিয়েছে নাড়াজোল। নদীর জল যেমন মাটিকে উর্বর করে, তেমনই ইতিহাসও এখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুষ্ট করেছে এক রাজবংশকে। দিল্লির সিংহাসনে তখন সৈয়দ বংশের দ্বিতীয় শাসক সিকন্দর শাহ। ঠিক সেই সময়ে পল্লি বাংলার বুকে রাজপরিবারের ভিত্তি স্থাপন করলেন ইছাই ঘোষের বংশধর উদয়নারায়ণ ঘোষ।
তার পরে কেটে গিয়েছে কয়েক প্রজন্ম। উদয়নারায়ণের উত্তরসূরি প্রতাপনারায়ণ, যোগেন্দ্রনারায়ণ, ভরতনারায়ণ হয়ে ইতিহাস এসে দাঁড়ায় কার্তিকরামের সময়ে। সময়ের মোড় ঘুরতে শুরু করে তখন থেকেই। বাংলার শাসক সোলেমান কররানির কাছ থেকে ‘রায়’ উপাধি লাভ করেন তিনি। পরে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে বলবন্ত সিংহ রায় পান ‘খান’ উপাধি। সেই থেকে এই পরিবারের পরিচয় বদলে যায়। ‘রায়’ হারিয়ে ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে ওঠে ‘খান’ পদবি।
মেদিনীপুরের ‘গুপ্ত সমিতি’ তখন ব্রিটিশদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন রাজপরিবারের নগেন্দ্রলাল খান। বিপ্লবী জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু, হেমচন্দ্র কানুনগোদের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উঠে আসে তাঁর নামও। ১৯০৮ সালের মেদিনীপুর বোমা মামলায় এই রাজবাড়ি থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ। আঠারো দিন কারাবাসের পরে প্রমাণের অভাবে মুক্তি পান তিনি। তবে নজরদারি বন্ধ হয়নি।
রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আর এক মহান বিপ্লবীর শৈশব। তিনি ক্ষুদিরাম বসু। তাঁর বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু নাড়াজোল রাজবাড়ির তহসিলদার ছিলেন। সেই সূত্রেই ছোট্ট ক্ষুদিরামের অবাধ যাতায়াত ছিল প্রাসাদে। হয়তো অন্দরমহলের কোনও গোপন আলোচনাই তাঁর মনে পুঁতে দিয়েছিল স্বাধীনতার প্রথম বীজ। কে জানে! অস্ত্রচর্চা, বোমা তৈরির কাজ, গোপন বৈঠক—সবই তো চলত। হেমচন্দ্র কানুনগো যেমন নিয়মিত আসতেন, তেমনই আসতেন ঋষি অরবিন্দ ঘোষ। দাদার সঙ্গে ঢুকতেন তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষও। আজ যে ঘরগুলিতে নিস্তব্ধতা বাসা বেঁধেছে, একদিন সেই ঘরেই বোনা হয়েছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন।
১৯৩৮-এ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের মেদিনীপুর বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরে নাড়াজোল রাজবাড়ির কাছারি ময়দানেই কর্মীসভা করেছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। তারও আগে-পরে তাঁর যাতায়াত ছিল এই রাজবাড়িতে। রাজপরিবারের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক। তবে বোমা বাঁধার পাশাপাশি অহিংসা আন্দোলনের পাশেও দাঁড়িয়েছে নাড়াজোল রাজবাড়ি। ১৯২৫-এ এই বাড়ি থেকেই অস্পৃশ্যতা নিয়ে ভাষণ দিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী। আবার কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে যোগ দিতে এসে এই রাজবাড়িতে রাত্রিবাস করেছিলেন মতিলাল নেহরু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তরুণ জওহরলাল।
সাহিত্য আর সংগীতেরও আপন ঠিকানা ছিল নাড়াজোল। কাজী নজরুল ইসলাম বহুবার এসেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেবেন্দ্রলাল খানের ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তাঁর পা-ও পড়েছে এই রাজবাড়িতে। এমনকী তাঁর ‘ভবঘুরে’ কবিতাতেও জায়গা পেয়েছে নাড়াজোলের নাম, ‘নাড়াজোলে বড়বাবু তখুনি/ শুরু করে বংশুকে বকুনি।’ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এসেছিলেন। জয়দুর্গার নাটমন্দিরের অলঙ্করণ খুব পছন্দ হয়েছিল তাঁর। শান্তিনিকেতনের উপাসনা গৃহ ওই ভাবেই তৈরি করতে চেয়েছিলেন। রাজবাড়ির অতিথি হয়ে এসেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও।
১৯৩০-এ পূর্ণ স্বরাজের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দেশ। ব্রিটিশদের রক্তচক্ষুর মধ্যেই ২৬ জানুয়ারি নাড়াজোল রাজবাড়ির কাছাড়ি ময়দানে উত্তোলন করা হলো জাতীয় পতাকা। গোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছিল সেই দিন। এই দীর্ঘ ইতিহাস, স্বাধীনতা আন্দোলনের অজস্র স্মৃতি, স্থাপত্যের অনন্য ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিতে ২০০৫-এ নাড়াজোল রাজবাড়িকে হেরিটেজ ঘোষণার দাবি ওঠে। মান্যতা পায় তিন বছর পরে। ২০০৮ সালে রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে হেরিটেজের মর্যাদা পায় রাজবাড়ির বাসগৃহ, হাওয়া মহল, ধর্মমন্দির, রাসমঞ্চ, ষষ্ঠ শিবালয়, সমাধিমন্দির, জলহরি, অস্ত্রভাণ্ডার, বৈঠকখানা, রানিমহল, দুর্গাদালান, গানশালা, কাছারিবাড়ি, মহাফেজখানা এবং এক সময়ের আভিজাত্যের সাক্ষী লন টেনিস গ্রাউন্ড।
কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরল কই? ২০১০-এ সংস্কারের জন্য ৪২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। কিন্তু হাওয়া মহলের সামান্য অংশে মেরামতি ছাড়া বাকিটা দীর্ঘ নীরবতা। সময়ের ক্ষয়, বৃষ্টির জল আর অবহেলা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে ছ’শো বছরের ইতিহাসকে। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের আধিকারিকরা দু’বার রাজবাড়ি পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। হাওয়া মহল, জলহরি এবং রট আয়রনের নাটমন্দির অধিগ্রহণের পরিকল্পনা ছিল তাদের। তার জন্য প্রয়োজন ছিল রাজ্য সরকারের ‘নো অবজেকশন’ সার্টিফিকেট। কিন্তু কোনও এক অদৃশ্য কারণে তা মেলেনি।
তবে হাল ছাড়ছেন না ‘নাড়াজোল আর্কিওলজিক্যাল প্রিজার্ভেশন কমিটি’-র সম্পাদক সন্দীপ খান। তিনি বলছেন, ‘আমরা চাই, যত দ্রুত সম্ভব ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ এই রাজবাড়ি গ্রহণ করুক। মুখ্যমন্ত্রী, স্থানীয় বিধায়ক, প্রশাসন—সবার কাছে এই আবেদন জানাচ্ছি।’ আশার প্রদীপ নেভেনি। পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন চন্দ্রকোনার বিধায়ক সুকান্ত দোলই। খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে এই অবহেলার খতিয়ান তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। রাজবাড়ির ইতিহাস নিয়ে গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করা দেবাশিস ভট্টাচার্যের গলাতেও একই আর্তি। তাঁর মতে, ‘নাড়াজোলের ইতিহাস তো কেবল ইট-পাথরের গল্প নয়, এ যে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের এক জ্বলন্ত দলিল।’
রাজবাড়ির দেওয়ালের পলেস্তরা এখনও খসে পড়ছে। কার্নিশ হয়ে থামে ছড়িয়ে পড়েছে বট-অশ্বত্থের শিকড়। তবে ইতিহাস পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। এই রাজবাড়ির বাতাসে কান পাতলে আজও নেতাজির গলা শোনা যায়। কাছাড়ি ময়দানের উপরে যেন এখনও হাওয়া দোলে সেই তেরঙা। যে পতাকার দিকে তাকিয়ে একদিন স্বাধীনতার শপথ নিয়েছিল গোটা জনপদ, ‘ছাড়গো, ছাড় শোক-শয্যা/ কর সজ্জাপুনঃ কমল-কনক-ধন-ধান্যে/ জননী গো, লহ তুলে বক্ষে/ সান্ত্বন-বাস দেহ’ তুলে চক্ষে...।’