• সিকিমে টানেলে ভয়াবস ধস ও মিথেন গ্যাস লিক করে বিস্ফোরণ: মৃত ১১ জন, আটকে এখনও একাধিক বাগান শ্রমিক
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ২১ জুলাই ২০২৬
  • দক্ষিণ সিকিমের নামচি জেলার অন্তর্গত সমরডুং-এর ‘এডিআইটি-৩’ টানেলে মিথেন গ্যাস লিক করে বিস্ফোরণ ও তারপরে বিশাল ভূমিধসের জেরে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১১ জন শ্রমিক। মৃতদের সিংহভাগই পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও ডুয়ার্স অঞ্চলের বাসিন্দা। সুড়ঙ্গের মুখ সম্পূর্ণ বুজে যাওয়া এবং ভেতরে বিষাক্ত মিথেন গ্যাসের প্রভাব বাড়তে থাকায় এখনও বেশ কয়েকজন ভেতরে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঘটনার খবর পেয়ে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং-এর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সমস্ত ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

    প্রশাসন সূত্রে খবর, সোমবার বিকেলে তিস্তা স্টেজ-৬ প্রকল্পের কাজ চলাকালীন আচমকাই এডিআইটি-৩ টানেলে জমে থাকা বিষাক্ত মিথেন গ্যাস নির্গত হতে শুরু করলে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এর পরপরই সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে নেমে আসে এক বিশাল ধস, যার ফলে ভিতরে প্রবেশের পথটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ঘটনার সময় ভিতরে ইঞ্জিনিয়ার, আধিকারিক সহ ২৭ জন কর্মী কর্মরত ছিলেন। ধসের পর বিষাক্ত মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি এবং অক্সিজেনের তীব্র ঘাটতির কারণে উদ্ধার অভিযান মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

    জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সিকিম পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। পাকইয়ং ও শিলিগুড়ি থেকেও বিশেষ সরঞ্জাম ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। নামচির জেলাশাসক আনুফা তামলিং জানান যে তাঁদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো সুড়ঙ্গের ভেতরে ক্রমাগত অক্সিজেন সরবরাহ করা এবং বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাব কমিয়ে আটকে পড়াদের সুরক্ষিতভাবে বাইরে বের করে আনা।

    এই মর্মান্তিক ঘটনায় সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও মালবাজার মহকুমার চা বাগান অঞ্চলগুলোতে। পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যাওয়া যে ১১ জন প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জলপাইগুড়ির হরিণাথপুরের তুফান দাস এবং গ্রাসমোর চা বাগানের আনন্দ তোপনু। মেটেলি ব্লকের কিলকোট চা বাগানের ১১ নম্বর লাইন থেকেই একসঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন বাইকিসের ওরাওঁ, গ্যাবরিয়েল টিগ্গা ও শিবা ওরাওঁ।

    একই ব্লকের নাগেশ্বরী চা বাগানের অমিত লাল কোরে এবং ইংডং চা বাগানের শ্যাম ওরাওঁ-এর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নিহতদের তালিকায় রয়েছেন নাগরাকাটার মনমোহনপাড়ার অর্জুন সাঁওতাল, সুলকাপাড়ার বলো ওরাওঁ, বিন্নাগুড়ির তেলিপাড়া চা বাগানের আদেশ ওরাওঁ এবং পূর্ব খাইরবাড়ির গোরা ওরাওঁ। মেটেলির কিলকোট চা বাগান থেকে একই সাথে তিনজনের মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকা শোকে পাথর হয়ে গিয়েছে এবং মৃতদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে ডুয়ার্সের আকাশ-বাতাস।

    বিপর্যয়ের খবর পাওয়া মাত্রই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাংকে ফোন করে উদ্ধারকাজের বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্র থেকে সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও ত্রাণ সহায়তার কথা নিশ্চিত করেন। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী তামাং নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে জানান, সিকিম সরকার এই কঠিন সময়ে মৃতদের পরিবারগুলোর পাশে রয়েছে এবং উদ্ধারকাজে কোনো ফাঁক রাখা হচ্ছে না। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে ধসের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছনোর নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। তবে বিষাক্ত গ্যাস ও প্রতিকূল আবহাওয়া এই অভিযানের গতি কিছুটা শ্লথ করে দিয়েছে। আটক বাকি কর্মীদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে গোটা রাজ্য।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)