• বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক, কী প্রতিক্রিয়া বিশিষ্টজনেদের
    আজকাল | ২২ জুলাই ২০২৬
  • পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ভাবে বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সোমবার ঘোষণা করেন, "এ বার থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক"।  ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যে সমস্ত সরকারি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহার করার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই সিদ্ধান্তকে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনেরা কীভাবে দেখছেন, জানতে চেয়েছিল আজকাল ডট ইন।  সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী থেকে চলচ্চিত্র পরিচালক, সঙ্গীতশিল্পী জানালেন তাঁদের অভিমত৷ 

    অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং পুরাণ বিশেষজ্ঞ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি বলেন, "সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই৷ পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষার অগ্রাধিকার থাকাই কাম্য৷ তবে সরকারি কাজে সাধারণ মানুষ যুক্ত তাই সহজ সরল বাংলা ভাষার প্রয়োগ হওয়া কাম্য৷"সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, "এই সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই৷ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। এর ফলে বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে৷" 

    সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেন, "এই সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই৷ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। এর ফলে বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে৷"

    অধ্যাপক এবং কবি অংশুমান কর বলেন, "সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন জানাচ্ছি। এটা তো আমাদের বহুদিনের দাবি ছিল যে সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার করতে হবে। নানা ভাষাভাষী মানুষের বাস, অনেক সময় নানা ছলছুতোয় বাংলা ভাষাকে অপমান করা হয়, কিন্তু এখন পশ্চিমবঙ্গে থেকে বাংলা ভাষার অমর্যাদা করার আগে তাঁরাও দু'বার ভাববেন৷ কাজের জন্য বাংলা শিখতেও হবে৷ এত বছর ধরে আমরা সমস্ত সরকারি চিঠিপত্র ইংরেজিতেই হত। সকলে ইংরাজি বুঝতে পারেন না৷  বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার লগ্নে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কৃষকের জন্য যদি কোনো নির্দেশনামা সরকার জারি করে আর সেটি লেখা হয় ইংরেজি ভাষায়, তাহলে যাদের জন্যই নির্দেশনামা জারি করা হল তারা এর তো কিছুই বুঝতে পারবেন না। তবে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এমন অনেক মানুষ যুক্ত যাঁরা বাংলা জানেন না৷ তাই এমন বাংলায় যেন নির্দেশনামা জারি করা না হয়, যে বাংলা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য ভাষাবিদ প্রয়োজন হয়। কেবল সরকারি কাজ নয়, সরকারি চাকরির পরীক্ষাতেও বাংলা ভাষাজ্ঞান যাচাইয়ের জন্য একটা পেপার থাকা উচিত৷ এই সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে আমার আশা, বাংলা পড়ার ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীদেরও আবার পুরনো আগ্রহ তৈরি হবে এবং কলেজগুলোতে আর আসন ফাঁকা থাকবে না৷" 

    বাম নেত্রী দীপ্সিতা ধর বলেন, "আমিতো অবশ্যই চাইব যে বাংলা ভাষা অগ্রাধিকার পাক। এর জন্য প্রাথমিকভাবে বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলো খুলতে হবে৷ যেগুলো বিগত সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে এবং এই সরকারের আমলেও সেই সমস্ত স্কুল খোলার প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে না। বাংলা মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করতে হবে। তাহলেই বাংলা ভাষা প্রাধান্য পাবে৷" কথ্য এবং লিখিত ভাষার তফাত প্রসঙ্গে দীপ্সিতা বলেন, "কখনও কখনও ফর্ম ফিলাপ করতে গেলে বাংলা ভাষার থেকে ইংরাজি সহজ মনে হয়৷ তাই সরকারি কাজের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার সরলীকরণ করাও দরকার৷"

    পরিচালক অরিন্দম শীল বলেন,  "আমাদের পূর্বজরা অর্থাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়রা একটা সময় রাস্তায় নেমেছিলেন যে কলকাতার সমস্ত দোকানের ইংরেজি নাম বদলে বাংলায় করার জন্য। আজকাল পত্রিকার পক্ষ থেকেই বাংলা ভাষার এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল৷ আন্দোলনের নাম ছিল 'নবজাগরণ'। আমরা আমাদের বাংলা ভাষাকে নিয়ে গর্ববোধ করব, বাংলা ভাষার প্রয়োগ করব, এটা তো অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সেটাই হওয়া উচিত। একটা অদ্ভুত ট্রেন্ড হচ্ছিল, বাংলা চলচ্চিত্রের নামও ইংরেজিতে লেখা হচ্ছে। আবার এখন হোয়াটসঅ্যাপের ভাষাও বড় অদ্ভুত৷ দক্ষিণের দিকে কিন্তু এমনটা হয় না। অনেক ন্যাশনাল লেভেল টিভিসিতে একটা অদ্ভুত বাংলার তর্জমা হয় এবং সেটা সচেতন না থাকার ফল। ভাষার বিবর্তন হচ্ছে, কমিউনিকেশনের ভাষাটা কিন্তু একটু সহজ সরল হওয়া উচিত। আমরা যেহেতু প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি আমাদের কথার মধ্যে, অনেক সময় তার সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না, সেক্ষেত্রে অবশ্যই কিছুটা সাহায্য করা প্রয়োজন কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত সাদরে গ্রহণযোগ্য।"

    কলকাতার বইপাড়ায় পরিচিত দে'জ পাবলিশিং। দে'জ এর পক্ষ থেকে সুদীপ্ত দে বলেন, "অনেক ইংলিশ মাধ্যম স্কুলে বাংলা পড়ানো হয় না, অথবা বাংলা বা হিন্দির মধ্যে বেছে নিতে হয়৷ মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে বাঙালি হিসাবে গর্ববোধ করছি।" এই সিদ্ধান্ত কি বইয়ের ব্যবসায়িক দিক থেকেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে? সুদীপ্ত দে বলেন, "বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অবশ্যই স্কুলে বাংলা পড়ানো খুবই জরুরি। যদি বাংলা স্কুলে পড়ানো হয়, বিক্রির থেকেও বড়ো বিষয় ভাষাটাকে বাঁচিয়ে রাখা। বাংলা ভাষা থাকলে বই থাকবে, বই থাকলে বাংলা ভাষা থাকবে। ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অতুলনীয়।"

    বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক এবং সঙ্গীতশিল্পী ড: শ্রুতি গোস্বামীর অভিমত, "এই সিদ্ধান্ত সাধুবাদযোগ্য। তবে, শীর্ষে যা বলা হল, ধাপে ধাপে গোটা ব্যবস্থায় কীভাবে সেই কথা কার্যকর হবে, সেই পদ্ধতি নিয়ে সংশয় থেকে যায়। কাজের ভাষা, অর্থকরী ভাষা হিসেবে বাংলাকে দেখতে হবে। ভাষা-সংস্কৃতির মৌলিক রূপের প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। আর, বাংলা ভাষাও তো ঠিক একটাই চরিত্রের নয়। তার বহুবর্ণ চেহারাকে বজায় রাখা গেলে তবেই লাভ। সরকারি কাজ মানে মানুষের কাজ, নেতাদের কাজ নয়। নেতাদের মুখে ক্ষমতার যে ভাষা রোজ ব্যবহৃত হচ্ছে, আশা করি সরকার তার থেকে দূরে থাকবেন।"

    সাহিত্যিক বিনোদ ঘোষালও মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, " এই উদ্যোগটি আমাদের পূর্বতন রাজ্য সরকারেরও নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তাঁরা মুখেই বাংলা বাংলা করে চেঁচিয়েছেন কাজে করার পরিবর্তে। বরং ভোটারদের ভয় দেখানো হতো যে বিজেপি সরকার এলে তারা হিন্দি আগ্রাসন আনবে, বাংলা ভাষা কোণঠাসা হয়ে পড়বে; উল্টো দেখা গেল যে তারা এসে মাস দুয়েকের মধ্যেই বাংলা ভাষাকে প্রধান সরকারি ভাষা হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা করল। জেন-জি (Gen-Z) মাতৃভাষার থেকে অনেকটাই বিযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সরকারি উদ্যোগের কারণে, বাংলা ভাষার কাছে নতুন প্রজন্ম আবার ফিরবে। একটা ভাষা একটা জাতির আত্মপরিচয়।" 

    বাংলা সাহিত্যেরও উন্নতি হবে এই সিদ্ধান্তে? বিনোদ ঘোষাল বলেন, "একটা ভাষার উন্নতিকরণে সাহিত্যের একটা বড় গুণ থাকে। বাংলা ভাষা যখন সরকারি প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হবে, সেখানে আমাদের যে বাংলা সাহিত্যের গুণ, তার যে প্রসাদগুণ, সেটারও আঁচ কিন্তু সেই সমস্ত চিঠির বয়ানে, সেই বিজ্ঞপ্তির বয়ানে, সেই নির্দেশিকার বয়ানের মধ্যে আসবে। সাধারণ মানুষ অনেকেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত নন। এখন তাঁদেরও কাজের ক্ষেত্রে মনের ভাব প্রকাশ করতে সুবিধা হবে৷ তবে খুব সহজ সাধারণ ভাষা ব্যবহার করাই ভাল৷ তৎসম শব্দ জটিল বাংলা শেখার জন্য বইপত্র রয়েছে৷ তাই কাজের ক্ষেত্রে যতটা সহজ বাংলা করা যায় সেটাই ভাল৷"
  • Link to this news (আজকাল)