সিকিমের নামচি জেলায় তিস্তার নির্মীয়মাণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হলো ২০। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। এখনও ৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে সিকিম প্রশাসন সূত্রে খবর। দুর্ঘটনার পর থেকে টানা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), সেনাবাহিনী, রাজ্য পুলিশ, দমকল এবং NHPC-র বিশেষজ্ঞ দল। দুর্ঘটনায় অন্তত ২৭ জন সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু’জন কোনওক্রমে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। ২০ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। বাকি পাঁচজনের খোঁজে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সোমবার দুপুরে নামচি জেলার সামারদুং এলাকায় NHPC-র তিস্তা স্টেজ-VI জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে আচমকাই ধস নামে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের জেরে সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তূপে আটকে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ভিতরে আটকে পড়েন বহু শ্রমিক ও প্রকল্পের কর্মী। প্রশাসনের একটি সূত্রের দাবি, সুড়ঙ্গের ভিতর জমে থাকা মিথেন গ্যাসে আচমকা বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের কারণেই ধস নামে সুড়ঙ্গের ভিতরে।
প্রাথমিক ভাবে পুলিশ এবং দমকল কর্মীদের নিয়ে তৈরি উদ্ধারকারী দল ১৬ জনকে টানেল থেকে বের করে আনতে সক্ষম হলেও পরে জানা যায়, যে অংশে ধস নেমেছে তার উল্টো দিকে আরও ২৭ জন কর্মী আটকে রয়েছেন। রাতে উদ্ধার কাজে যোগ দেন পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের এনডিআরএফ দল। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ধস সরিয়ে ১৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পরে বুধবার সকালে উদ্ধার হয় আরও দু'জন শ্রমিকের মৃতদেহ। তবে শ্রমিকদের বের করে আনতে উদ্ধারকারী দলকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। ধস পেরিয়ে টানেলের ভিতরে ঢুকতে গিয়ে অনেকেই মিথেন গ্যাসের তীব্রতায় অসুস্থ বোধ করেন, কয়েকজন জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন।
তবে শুধু মিথেন গ্যাসই নয়, এর পাশাপাশি সুড়ঙ্গের ভিতরে ক্রমাগত ধস নামার আশঙ্কা, পাথর ও কাদার স্তূপ এবং সংকীর্ণ জায়গা উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধাপে ধাপে ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়। ফলে অভিযান সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের আশা, নিখোঁজ পাঁচজনের সন্ধানে চলা অভিযান যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা যাবে। তবে উদ্ধারকারী দল জানিয়েছে, পাহাড়ি এলাকার প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং ধসের ঝুঁকির কারণে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে।
জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার সুজাতা কুমারী বীণাপানি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির লোকজনদের দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত জেলাশাসক এবং ট্রাফিকের ডিএসপি।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত ২০ শ্রমিকের মধ্যে ১৩ জনকে শনাক্ত করা গিয়েছে। তাঁদের মধ্য়ে নয় জন জলপাইগুড়ির বাসিন্দা, দু'জন আলিপুরদুয়ারের, একজন পাঞ্জাবের এবং একজন সিকিমের। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ৪৩ বছর বয়সি অনীশ মোহন, তিনি কেরালার জিওলজিস্ট। জলপাইগুড়ি জেলার মৃত নয় জন মেটেলি এবং বিন্নাগুড়ির বাসিন্দা।
সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং দুর্ঘটনাস্থলের পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখছেন এবং প্রশাসনের সব বিভাগকে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মৃতদের পরিবারের জন্য। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং ৪ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজ নেন এবং কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মৃতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন।
NHPC জানিয়েছে, আটকে পড়া কর্মীদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে। সংস্থার শীর্ষ আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে উদ্ধার অভিযানের তদারকি করছেন। দুর্ঘটনার কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্তও শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং জানিয়েছেন, এই সুড়ঙ্গ ধসের কারণ খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হবে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীতে সিল্কিয়ারা-বারকোট সুড়ঙ্গ বিপর্যয়ে আটকে পড়েন ৪১ জন শ্রমিক। ৪০০ ঘণ্টার দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পরে তাঁদের সম্পূর্ণ নিরাপদে ও জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। ওই দুর্ঘটনায় কোনও শ্রমিকের মৃত্যু হয়নি, বরং ১৭ দিনের লড়াইয়ের পর তাঁরা সবাই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন। সুড়ঙ্গ ধসের ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায়, যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ধ্বংসস্তূপের ভিতর পাইপলাইন তৈরি করে তাঁদের কাছে খাবার, জল এবং অক্সিজেন পাঠানো হয় এবং শেষপর্যন্ত সফলভাবে তাঁদের বের করে আনা হয়।
নামচি জেলার সামারডুং এলাকায় NHPC-র তিস্তা স্টেজ-VI জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী এখনও ৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাঁদের খোঁজে উদ্ধার অভিযান চলছে।
NDRF, ভারতীয় সেনা, সিকিম পুলিশ, দমকল বিভাগ এবং NHPC-র বিশেষজ্ঞ দল যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।
মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি, সুড়ঙ্গের ভিতরে পুনরায় ধসের আশঙ্কা, পাথর ও কাদার স্তূপ এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ জায়গা উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছে।
মৃত ২০ জনের মধ্যে ১১ জন উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা। তাঁদের অধিকাংশই জলপাইগুড়ির মেটেলি ও বিন্নাগুড়ি এলাকার।
সিকিম সরকার মৃতদের পরিবারকে ৪ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী PMNRF থেকে মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তার ঘোষণা করেছেন।
সিকিম সরকার সুড়ঙ্গ ধসের কারণ খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের নির্দেশ দিয়েছে।